ভক্তদের প্রাণপুরুষ কুমিল্লার হারাধন গোস্বামী

ভক্তদের প্রাণপুরুষ কুমিল্লার হারাধন গোস্বামী
মমিনুল ইসলাম মোল্লা

বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গীতা ,ভগবত গীতা, ও অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ, ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ, পর্যালোচনা , সাধ্যায় যজ্ঞে অংশগ্রহনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কাজে ব্যাস্ত থাকেন কুমিল্লার দেবিদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামের শ্রী হারাধন গোস্বামী (চক্রবর্তী)। এছাড়া ভক্তদের সুখ দু:খে তাদের কাছে ছুটে যান তিনি। তাদেরকে পরমাত্মার সন্ধান দেন। হিন্দু ধর্মের উচ্চ আধ্যাতিক কোন ব্যক্তিকে শ্রদ্ধার্থে ঠাকুর বলা হয়। হারাধন গোস্বামীকেও কেউ কেউ হারাধন ঠাকুর বলে অভিাহত করেন। হারাধন চক্রবর্তী বা মালু ঠাকুর এর বর্তমান বয়স ৭২ বছর। তার পিতার নাম মৃত সুরেশ চক্রবর্তী এবং মাতার নাম মৃত হীরন বালা দেবী। তিনি বৃদ্ধ বয়সেও বক্তদের ডাকে সাড়া দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে দূর-দূরান্তে চলে যান। 

গোস্বামী শব্দটি সংস্কৃত গো+স্বামিন থেকে এসেছে। গোস্বামী অর্থ গোসমূহের বা পৃথিবীর অধিপতি বা রক্ষক বা ধর্মোপদেষ্টা। বিশেষ করে বৈষ্ঞব গুরু ও ভক্তশ্রেষ্ঠদের উপাধিবিশেষ। শ্রী হারাধন চক্রবর্তীকে সুধীজন ভক্তি কওে ‘ দাদা”বলে ডাকে। হারাধন গোস্বামী ১৯৭০ সালে চাঁদপুর জেধার মতলবের মৃত জগদীশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের সাহচর্য লাভ করেন।  তিনি তখন একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য এলাহাবাদে এসেছিলেন। তিনি তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ধর্মীয় পরিভাষায় দীক্ষা হচ্ছে কোন বিশেষ অনুষ্ঠান ও সংকল্প করে কোন কর্মে প্রবৃত্ত হওয়া। সেখানে তিনি তন্ত্র বা উপাসনাবিধি এবং উপাস্য দেবতার পূজার মন্ত্র বা গুরুমন্ত্র লাভ করেন। তিনি জপমালা পরিধান করেন। এই জপমালা হচ্ছে হরির নামের মালা। হরি নামের মালা হরি নাম জপকালে  ব্যবহৃত হয়। তিনি বিশ্বাস করেন এ মন্ত্র জপ করলে বিপদ এড়ানো যায়। ১৯৮৭ সালে তার প্রাণপ্রিয় গুরু জগদীশ দেহত্যাগ করেন। তার কাছ থেকে দীক্ষা লাভ করে গুরুর অনুমতি নিয়ে দীক্ষাদানের জন্য প্রস্তুতি নেন। তার অন্য আরেকজন গুরু ছিলেন কুমিল্লার মুরাদনগরের আকবপুরের মৃত নিরজ্ঞন গোস্বামী। তার কাছ থেকে ধর্ম সম্পর্কে তিনি বিশদ জ্ঞান লাভ করেন।“ তিনি তাকে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার সংযোগ স্থাপনের পদ্শতি শিক্ষা দেন।” ১৩৯৪ বঙ্গাব্দে তার গুরু নিরঞ্জন গোস্বামী মারা যান। ১৯৮০ সাল থেকে হারাধন সেবাব্রতের কাজ শুরু করেন। গুরুর অনুমতি নিয়ে প্রথমেই দেবিদ্ধারের বিষ্ঞুপুর গ্রামে দুর্গাপূজার দায়িত্ব নেন। ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে পেছনের দিকে গেলে দেখা যায়, বর্তমানে দুর্গাদেবীর আরাধনার যে পদ্ধতি চালু আছে তা ১৬১০ সালে ভারতের কলকাতার সাবর্ন রায় চৌধুরী পরিবারের আদলে তৈরি। সেখানেই প্রথম দেবী দুর্গার মধ্যস্থলে দেবী দুর্গার সিংহ বাহিনী ও মহিষা সরমামর্দিনী, তার ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষী ও নীচে গনেশ । বামপাশের উপরে দেবী স্বরস্বতী ও  নিচে কার্তিকের অবস্থান রয়েছে। অবশ্য কোথাও কোথাও এর ব্যতিক্রম ও রয়েছে। এধরণের পূজা পরিচালনায় ঠাকুরেরর অবদান মূখ্য। হারাধন চক্রবর্তী পূজা-অর্চনায় কখনও  কিছুচেয়ে  নেননি। জীবনের প্রথম পূজায় তাকে ১ হাজার টাকা সম্মানী বা দক্ষিণা দেয়া হয়।
শ্রী হারাধন গোস্বামীর নিকট এপর্যন্ত প্রায় ২০০০ লোক দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। তার ভক্তদে মধ্যে চট্টগ্রামের আশীষ কর , পটিয়ার সুভাষ ভট্টাচার্য, সিলেটের চিন্ময় দেবনাথ, চিন্তন দেবনাথ ও মৌলবাজারের প্রহলাদ কর্মকারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম আর সিলেটেই নয় সারা দেশেই তার ভক্তবৃন্দ রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও নরসিংদীর লোকেরা তাকে দীক্ষা গুরু হিসেবে তাদেও হৃদয়ে স্থান দিচ্ছে। এসব এলাকার ভক্তদের নাম কীর্তন ,পাঠ কীর্তনসহ বিভিন্ন প্রোগ্রামে তিনি অংশগ্রহণ করেন। তিনি মনে করেন ধর্মীয় জ্ঞান ও সাধনা মানুষকে শুধু আত্মার শান্তির বিধানই নয় বিভিন্ন ধরণের রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদ থেকে ও তাদেরকে রক্ষা করে। তাই ভক্তবৃন্দকে সকল সমস্যায় ঈশ্বরের কাছে সাহায্য প্রার্থনার শিক্ষা দেন। 
হিন্দুদের অসংখ্য দেব-দেব রয়েছে। পূজারি বা যজমান এর মানসিকতা ভেদে পূজা ২প্রকার। ব্যক্তিগত পূজা ও সমষ্টিক পূজা। ব্যক্তিগত পূজা ব্যক্তি পূজারী নিজেই করেন। এ পূজায় মূল বিষয় ব্যক্তিগত সাধনা। এ পূজায় মানস পূজাই প্রধান , উপচার নয়। অন্যদিকে সমষ্টিক পূজা পুরোহিত নিয়োগের মাধ্যমে করা হয়। এ ধরণের পূজা পঞ্চ উপচার বা বহু উপচারে করা হয়ে থাকে। হিন্দুদের দেবতা অনেক । নিজ নিজ কর্ম অনুসারে তাদের ভাগ করা হয়েছে । যেমন হিন্দু দের প্রধান ৩ দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ। তাদের সহধর্মিণীরা হলেন যথাক্রমে সরস্বতী ,ল²ী এবং পার্বতী (দুর্গা)। প্রধান দেবতারা সকল শক্তির অধিকারী হলেও তাদের কিছু নির্দিষ্ট কাজ সমাধান করতে নিয়োজিত থাকেন। যেমন প্রজাপতি  ব্রহ্মার কাজ সৃষ্টি করা, অর্থাৎ তিনি এই ব্রহ্মা এবং এর সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন । বিষ্ণু হলেন  ব্রহ্মার সৃষ্ট সৃষ্টির পালন কর্তা । তিনি সকল কিছু পালন করেন,আর যিনি পালন করেন রক্ষার দায়িত্ব তো তাঁরই । মহাদেব যাকে শিব ও বলা হয়ে থাকে , তিনি হলেন ধ্বংস কর্তা। তার কাজ হল যা কিছু সৃষ্টির জন্য অনিষ্টকর তা তিনি ধ্বংস করেন। শ্রী হারাধন চক্রবর্তী  একজন নিরামিষভোজী। গত ৩৫ বছর ধরে তিনি নিরামিষ ভোজন করে আসছেন। যিনি তার রান্না  করবেন তাকেও নিরানিমষভোজী হতে হয়। যদি এধরণের কোন লোক না পাওয়া যায় তাহলে তিনি নিজেই নিজের রান্না সম্পন্ন করেন। তবে অধিকাংশ যায়গায় তিনি নিজেই নিজের রান্না সম্পন্ন করেন। তার ছেলে নিতাই চক্রবর্তী বলেন-বাবার রান্নায় শাকসব্জির পাশাপাশি ঘি এবং নারকেলের প্যাধান্য থাকে। হারাধনবলেন , যদি অন্তত এক সপ্তাহের জন্য হলেও কেউ নিরামিষভোজী হয় তাহলে সাস্থের জন্য যে লাভ হবে তা অন্য কোন খাবার কিংবা  ওষধে হবে না। সাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দেয়া তথ্য মতে একজন নিরামিষভোজীর খাদ্য তালিকায় লাউ,মিষ্টি কুমড়া, সবুজ শাক, বাধাকপি ইত্যাদি থাকে। এগুলো দেহের সব বিষাক্ত উপাদান দেহের বাইরে বের করে দেয়। এছাড়া সব্জিতে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াাম থাকে যা আমাদেও হাড়কে শক্ত রাখে। কার্বহাইড্রেটের পরিমানও বেশি থাকায় তাদের দেহে শক্তির অভাব হয় না। শ্রী হারাধন গোস্বামী একজন খাঁটি বাঙ্গালি। তিনি বাংলার ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধূতি ও পাঞ্জাবী সব সময় পরিধান করেন।স্থানীয়রা জানান তাকে কেউ কোন দিন এ পোশাকের বাইরে পাজামা,পাঞ্জাবী, কিংবা লুঙ্গি,শার্ট পড়তে দেখেনি। তিনি বলেন ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত বাঙ্গালি মুসলমানরাও ধূতি-পাঞ্জাবি পড়তেন। পরবর্তীতে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দুদের মধ্যেও এ পোশাকের কদর কমে যায়। তবে তিনি সানন্দেই এ পোশাক পরিধান করেন। তিনি সবসময় “পৈতা ’ ব্যবহার করেন। পৈতা অর্থ পবিত্র । যা ধর্মীয় পরিভাষায় ব্রাহ্মনের কন্ঠে ধারনীয় যজ্ঞসূত্র নামে পরিচিত। বর্তমানে হিন্দু ধর্মীয় গুরু-সন্যাসীদেওরপ্রতি সাধারণ হিন্দুদেও ভক্তি কমে যাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। শুধু ধর্ম-কর্ম নিয়ে আছেন জীবিকা নের্বাহের জন্য অন্য কোন পেশা বেছে নেননি এমন ব্রাহ্মন বা ঠাকুর পাওয়া মুশকিল। এখন বাস্তাবতার তাগিদে অধিকাংশ ঠাকুর ব্রাহ্মনগনই অন্য কোন না কোন পেশার সাথে নিজেদেও জড়িত রাখছেন। কিন্তু হারাধন গোস্বামী তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তার ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে। তারা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং ঈশ্বরের আরাধনায় নিয়োজিত। তিনি শুধমাত্র হিন্দুদের সেবায় ও ঈশ্বরের আরাধনা নিয়েই ব্যাস্ত রয়েছেন। অপনার কী মনে হয় ঠাকুর-ব্রাহ্মন কিংবা গুরুদের প্রতি মানুষের ভক্তি কমে গেছে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন-ঠাকুরদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা কমেনি তবে অধিকাংশ মানুষ বর্তমানে পার্থিব বিষয়কে বড় করে দেখছে, মানুষের শ্রদ্ধা পেতে হলে গুরুকে অবশ্যই সততার সাথে নিষ্ঠা ও মনোবল ঠিক রাখতে হবে। প্রত্যোক সনাতন ধর্মাবলম্বীর উচিত পরমাত্মা লাভের সন্ধানে নিজকে ঈশ্বরের নিকট বিলিয়ে দেয়া।“
লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  প্রভাষক, সাংবাদিক ও ধর্ম বিষয়ক গবেষক,কুমিল্লা।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.