নব্বই দশকের কূরবানীর গরুর কথা//মমিনুল ইসলাম মোল্লা।।

নব্বই দশকের কূরবানীর গরুর কথা//মমিনুল ইসলাম মোল্লা।।

 নব্বই দশকের কূরবানীর গরুর কথা//মমিনুল ইসলাম মোল্লা।।

আছরের নামাজ শেষ হতেই গ্রামের পথগুলো যেন অন্যরকম ব্যস্ত হয়ে উঠল। কুরবানির ঈদ আর মাত্র দুইদিন বাকি। দাদা উঠানে বসে পান চিবুচ্ছিলেন, আর বাবা শরিকদের সাথে গরুর হিসাব মিলাচ্ছিলেন। আমাদের গরুটি তখন গোয়ালঘরের ভেতরে “খোঁয়াড়ে ফেলা” অবস্থায় দাঁড়িয়ে। মাটিতে ছোট্ট গর্ত করে তার পেছনের অংশ নামিয়ে রাখা হয়েছে। বাবা বললেন,

— “এতে পাছায় মাংস বেশি হয় রে!”

আমি দূর থেকে গরুটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বিশাল কালো ষাঁড়। মাথায় লাল কাপড় বাঁধা, শিংয়ে সাদা রঙের নকশা। গলায় গাঁদা ফুলের মালা ঝুলছে। মোহনপুর দিঘিরপাড় বাজার থেকে কিনে আনা হয়েছে পনেরো দিন আগে। শুনেছি, হাটে নাকি সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। জহির মুন্সীর আঠারো হাজার টাকার গরুর পর এটাকেই সবচেয়ে বড় বলা হচ্ছিল।

আমাদের বাড়িতে দুদিন থাকার পর গরুটি আবার অন্য শরিকের বাড়িতে যাবে। তখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গরু রাখার আলাদা ঘর ছিল। মা প্রতিদিন খড়, ভুসি আর কাঁঠালের পাতা এনে খাওয়াতেন। যেন কুরবানির গরু নয়, বাড়িরই এক সদস্য।

ঈদের আগের রাতে গ্রামের ছেলেরা এসে গরুর দাঁত দেখতে লাগল। একজন বলল,

— “দুই দাঁত পার করছে, দাম ঠিকই হইছে।”

আরেকজন পাশে বাঁধা এক বুড়ো গাই গরু দেখে হেসে উঠল,

— “গাইও বুড়া, বিয়ানও শেষ!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

কুরবানির দিন সকালবেলা গ্রামের বাতাসে অন্যরকম গন্ধ। তাকবির, মানুষের হাঁকডাক, আর রান্নার ধোঁয়া মিলে এক অদ্ভুত আবহ। কুরবানি শেষে দাদা গরুর ভূড়ি আর খুরগুলো গরিবদের দিয়ে দিলেন। বললেন,

— “এটাই তো ঈদের আসল আনন্দ।”

কিন্তু আমাদের ভাগে যে মাংস এল, তার বেশিরভাগই ছিল শক্ত আর বয়স্ক গরুর। মা বিকেলেই চুলায় বসালেন। মাংস সিদ্ধ হতে হতে এশার আজান পড়ে গেল। মনির ভাইয়ের আজান ভেসে এলো মসজিদ থেকে। নামাজ শেষে কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে আমরা মাটির ঘরে বসে খেতে শুরু করলাম।

দাদা নিজের হাতে কাজী লেবু কেটে মাংসের ওপর চিপে দিলেন। সেই টক গন্ধে পুরো ঘর ভরে গেল। আমি প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই বুঝেছিলাম—এই স্বাদ শুধু মাংসের নয়, এই স্বাদ নব্বই দশকের গ্রামের, মানুষগুলোর, আর হারিয়ে যাওয়া এক সরল সময়ের।

লেখক পরিচিতি -মমিনুল ইসলাম মোল্লা শিক্ষক সাংবাদিক ও কলামিস্ট, কুমিল্লা।।