মমিনুল ইসলাম মোল্লা,
পরিষ্কার
পরিচ্ছন্নতা তথা পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। যার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা যায়। কুরআন ও
সুন্নায় পরিচ্ছন্নতার চেয়ে আরও ব্যাপক শব্দ ‘তাহারাহ’ তথা পবিত্রতা ব্যবহার করা
হয়েছে। এই ‘তাহারাহ’ শব্দ যেমন কুফরী ও বিধার্মিকতা থেকে নিয়ে যাবতীয় পাপাচারের
মতো আভ্যন্তরীণ নোংরামি থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে, তেমনি তা সবরকমের বাহ্যিক
অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। বাহ্যিক পবিত্রতা একজন মুমিনের
স্বলাত শুদ্ধ হবার পূর্বশর্ত। তাই
জান্নাতের চাবি যেমন স্বলাত, তেমনি স্বলাতের চাবি পবিত্রতা।
তেমনি পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে পরিবেশ দূষণ রোধেও পবিত্র সুন্নাহে নানা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেমন বদ্ধ বা স্রোতের পানিতে পেশাব থেকে বারণ করে বলা হয়েছে, (আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে,) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বদ্ধ পানিতে পেশাব না করে অতঃপর তা দিয়ে গোসল করে।’ [বুখারী : ২৩৯; মুসলিম : ২৮২]
তেমনি পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করে পরিবেশ দূষণ রোধেও পবিত্র সুন্নাহে নানা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেমন বদ্ধ বা স্রোতের পানিতে পেশাব থেকে বারণ করে বলা হয়েছে, (আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে,) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বদ্ধ পানিতে পেশাব না করে অতঃপর তা দিয়ে গোসল করে।’ [বুখারী : ২৩৯; মুসলিম : ২৮২]
খাদ্য ঢেকে রাখাঃ
তেমনি খাদ্য ও পানীয়কে দূষণমুক্ত রাখতে পাত্র ঢেকে রাখাসহ বিভিন্ন জরুরি নির্দেশনা
দেয়া হয়েছে। যেমন জাবের ইবন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন, ‘তোমরা বাসন ঢেকে রাখো, পানপাত্রের মুখ বন্ধ রাখো, দরজা অর্গলাবদ্ধ করো এবং
এশার সময় তোমাদের শিশুদের সামনে রাখো। কেননা এসময় জিনরা ছড়িয়ে পড়ে এবং আছর করে। আর
তোমরা নিদ্রাকালে বাতিগুলো [প্রদীপসমূহ] নিভিয়ে দিও। কেননা ইঁদুর কখনো প্রদীপের
সলতে টেনে নিয়ে যায়। অতঃপর তা গৃহবাসীকে জ্বালিয়ে দেয়।’ [বুখারী : ৩৩১৬] ১. খাবারের
উপর পান করা তাঁর আদর্শ ছিল না, তাঁর জন্যে ‘নাবীয’ মানে পানিতে পাকা খেজুর ঢেলে রেখে
তা মিষ্টি করা, তিন দিন পর নেশাদ্রব্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় তিনি তা পান করতেন না।৩.
তাঁর অভ্যাসগত আদর্শ ছিল বসাবস্থায় পান করা এবং যে দাঁড়ানো অবস্থায় পান করে তাকে তিনি
ধমক দেন।৪. তিনি পানি পান করতে তিনবার নিঃশ্বাস নিতেন এবং বলতেন: “এটি অধিক তৃপ্তিদায়ক,
অধিক হযমকারী এবং অধিক উপকারী।”
পবিত্র খাদ্য খাওয়াঃ উপার্জেয় বস্তুটি পবিত্র (তাইয়্যিব) হওয়া প্রসঙ্গে
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘আর আহার কর আল্লাহ যা তোমাদের রিয্ক দিয়েছেন তা থেকে হালাল,
পবিত্র বস্তু। আর তাকওয়া অবলম্বন কর আল্লা হর যার প্রতি তোমরা মুমিন।’’ [সূরা আল-মায়িদাহ:
৫:৮৮।]
খানাপিনার
আদব ও দো‘আ :প্রথমে সতর্ক হতে হবে যে, খাদ্যটি হালাল ও পবিত্র (ত্বাইয়িব) কি-না (বাক্বারাহ
২/১৬৮)। নইলে তা খাবে না। অতঃপর খাওয়ার আগে অবশ্যই ভালভাবে ডান হাত ধুয়ে নিবে। ধোয়া
হাত দিয়ে অন্য কিছু ধরলে খাওয়ার শুরুতে পুনরায় হাত ধুবে। যেন অলক্ষ্যে সেখানে কিছু
লেগে না থাকে। ঘুম থেকে উঠে এলে অবশ্যই আগে মিসওয়াক করে নিবে। অতঃপর খাওয়ার শেষে দাঁতে
খিলাল করবে ও খাদ্য কণা বের করে ফেলে দিবে। কেননা এগুলি থাকলে পচে পোকা হয় এবং তা পেটে
গিয়ে পেট নষ্ট করে। অবশেষে পেট ও দাঁত দু’টিই বিনষ্ট হয়। স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে।
শুকরের মাংশ ঃ শুকরের মাংশ খাওয়া ইসলামে নিষেধ।অন্যান্য
পশুর গোশ্তের তুলনায় শূকরের গোশ্তে কোলেস্তেরল অধিকমাত্রায় থাকে। আর মানুষের শরীরে
কোলেস্তেরল বেড়ে গেলে মানবদেহের শিরাগুলো শক্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা বেড়ে যায়। শূকরের
গোশ্তের গঠন-প্রকৃতি খুবই ব্যতিক্রমধর্মী, অন্যান্য খাবারে তেলজাত এসিড থেকে তা
সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে কারণে তা সহজেই শুষণযোগ্য অন্যান্য খাবারের তুলনায়। ফলে রক্তে
কোলেস্তেরল বেড়ে যায়। শূকরের
গোশ্ত ভক্ষণ চুলকানি, এলার্জি, গেষ্ট্রিক ইত্যাদি বাড়িয়ে দেয়। শূকরের গোশ্ত ভক্ষণ
ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা কৃমি, ফুসফুসের কৃমি ও ফুসফুসের মাইক্রোবিক প্রদাহ থেকে জন্ম
নেয়।
মিসওয়াক করাঃইসলামে
শরীরের কোনো কোনো অঙ্গ পরিচ্ছন্ন রাখতে সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যেমন মুখ
ও দাঁত। দাঁত ও মুখের যত্নে মিসওয়াকের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত
হিসেবে গণ্য করা হয়েছে মিসওয়াক ব্যবহারকে। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে
বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘যদি
না আমার উম্মত অথবা (তিনি বলেছেন) মানুষের জন্য কঠিন হত তবে আমি তাদেরকে প্রত্যেক
স্বলাতের সঙ্গে মিসওয়াকের নির্দেশ (ওয়াজিব ঘোষণা) দিতাম।’ [বুখারী : ৮৮৭; মুসলিম :
২৫২]
প্রাকৃতিক সুন্নতঃ
আর এর পূর্ণতা হিসেবে উল্লেখ করা যায় ‘সুনানে ফিতরাত’ তথা প্রকৃতির সুন্নত খ্যাত
বিষয়গুলো। মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দশটি বিষয় ‘ফিতরাতে’[১] র অন্তর্ভুক্ত : গোঁফ
কাটা, দাড়ি লম্বা রাখা, মিসওয়াক
করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, চামড়ার ভাঁজের জায়গাগুলো ধৌত করা, বগলের নিচের চুল
তুলে ফেলা, নাভির নিচের চুল মুণ্ডানো, (বাথরুমের প্রয়োজন পুরণের পর) পানি দ্বারা
পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। বর্ণনাকারী বলেন, দশম বিষয়টি আমি ভুলে গেছি, যদি না তা হয়
‘কুলি করা।’ [সহীহ মুসলিম
: ২৭৫৭]
হায়েজ নিফাসঃ মহিলাদের মাসিক স্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার আলোচনা শেষে
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন
অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২২২}পরিচ্ছন্নতা রক্ষাকে ঈমানের অংশ বলে আখ্যায়িত করা
হয়েছে। যেমন আবূ মালেক আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ [মুসলিম
: ২২৩]
গোসল করাঃ
ব্যক্তির পরিচ্ছন্নতা, গৃহের পরিচ্ছন্নতা ও পরিপার্শের পরিচ্ছন্নতা- ইসলামে কোনোটাই
বাদ যায় নি। ব্যক্তির পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় অন্তত জুমাবারে গোসলের গুরুত্ব দেয়া
হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো হাদীসে এ ক্ষেত্রে ‘ওয়াজিব’ শব্দও উল্লিখিত হয়েছে। যেমন :
আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘জুমার দিন (শুক্রবার) গোসল করা প্রতিটি সাবালক
ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব।’ [বুখারী : ৪৭৯]
রাস্তা পরিষ্কারঃ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে,
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, রাস্তা থেকে তুমি যে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেল, তাও
সাদকা। [বুখারী : ২৯৮৯; মুসলিম : ১০০৯]
আরেক
হাদীসে এসেছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা লা‘নতকারী (অভিশাপের কারণ) দু’টি কাজ থেকে
বেঁচে থাকো। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, লা‘নতকারী (অভিশাপের কারণ)
দু’টি কাজ কী? তিনি বললেন, যে মানুষের চলাচলের রাস্তায় কিংবা তাদের ছায়ায় পেশাব-পায়খানা
করে।’ [আবূ দাঊদ : ২৫; মুসনাদ আহমদ : ৮৮৫৩]পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাকে
ঈমানে অংশ আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ব্যাভিচার না করাঃ তরুণ
সমাজের প্রতি ইসলামের আহবান ও অনুশাসন এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে বিশেষভাবে কার্যকরঃএকটি
নিদর্শন বলে ঘোষণা দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,‘‘তাঁর নিদর্শনের একটি এই যে,
তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে
সুখ-শান্তি লাভ করতে পার। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করেছেন।
অবশ্যই এর মধ্যে চিন্তাশীল লোকদের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে’’। [আর-রূম : ২১]চলার পথে যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার স্বভাব বদলাতে হবে। মেনে
চলতে হবে নির্দিষ্ট জায়গায় বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলার নিয়ম। টয়লেটে গিয়ে টিস্যু পেপার
নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। ব্যবহারের পর পর্যাপ্ত পানি ঢেলে পরিচ্ছন্নতা বজায়
রাখতে হবে। কী আশ্চর্য, আমরাই কষ্ট পাই আবার একটু খেয়াল করলেই আমরা
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পারি। আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন ও
পরিপাটি রাখতে সচেষ্ট হই, তবেই কেবল মুক্তি। আমরাই কিনা পরিবেশ নোংরা করি! আমাদের স্বাস্থ্যহানীতে নিজেরাই
ভূমিকা রাখি!
লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক , সাংবাদিক ও
ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা।
