বিদ্যুৎ স্বনির্ভরতা ও উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ
মমিনুল ইসলাম মোল্লা২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ছিল ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। মহাজোট সরকারের রূপকল্প ২০২১ এর ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৩ সালের মধ্যে ৭ হাজার, ২০১৫ সালের মধ্যে ৮ হাজার এবং ২০২১ সাল নাগাদ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ভূমিকা অপরিসীম। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রথমে কয়েকটি ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রের অনুমোদন দেয় তত্তাবধায়ক সরকার। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। ১৯৯৬ সালে “ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি ” প্রণয়ন করা হয়। এতে দরপত্র ছাড়া আর কোন বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব গ্রহণ করার রীতি বন্ধ করার হয়। ২০০৩ সালে পিপিআর তৈরি হয় এবং “ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি ” ও এর আওতায় আনা হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সুস্পষ্ট নীতি মালা ছিল। রেন্টাল পদ্বতিতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হয় সরকারকে। শুরুতে বলা হয়েছিল এগুলো ক্ষনস্থায়ী। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এগুলো কেন আবার নবায়ন করা হলো তা ভেবে দেখার বিষয়। সরকার এর আগে বহুবার বলেছে আর কোন ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হবে না। কিন্তু তারপরও একটার পর একটা কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। মূলত সরকারি বা বেসরকারিভাবে বড় ধরণের কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত না হওয়ায় ছোট ছোট রেন্টাল বা কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো সুযোগ পাচ্ছে। শুরুতে ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৩ বছর ৩ বছর এবং ফার্নেস ওয়েল চালিত কেন্দ্রগুলো ৫ বছরের জন্য ভাড়া করা হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুতে সরকার স্বয়ং সম্পূর্ণ হতে না পারায় সেগুলোর মেয়াদ ক্রমশই বাড়ছে। প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং চার্জের নামে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মেগাওয়াট প্রতি উৎপাদন ক্ষমতার উপর ৯ হাজার থেকে ৩০ হাজার ডলার ভাড়া, কেন্দ্রগুলোকে ভর্তুকি মূল্যে তেল সরবরাহ ও উৎপাদিত উচ্চমূল্যে কেনার কারণে ক্রমেই লোকসানের দিকে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। দেশের বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানর ব্যাপারে বিরাষ্ট্রীয়করণের দাবী উঠলেও বিদ্যুতের ব্যপারে তা উঠেনি। তারপরও সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি কেন্দ্রগুলোর বিমাতাসুলভ আচরণের সম্মুখীন হচ্ছে। সরকারি হিসেবে ২০০৯- ২০১৪ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চুক্তি স্বাক্ষর হয় ৭৬টি এর ক্ষমতা ১১১২৬ মেগাওয়াট । এর মধ্যে চালু হয় ৬৫টি, এর ক্ষমতা ৬৩২৩ মেগাওয়াট, নির্মনাধীন ৩২টি ও ক্ষমতা ৭০৩০ মেগাওয়াট দরপত্র প্রক্রিয়াধীন ২০টি এবং এর ক্ষমতা ৪০১৭ মেগাওয়াট এবং পরিকল্পনাধীন ৯টির ক্ষমতা ৮৪০৫ মেগারয়াট। এসময় বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ৫৩% বেসরকারি ৪০ % এবং বাকি ৭ % বিদ্যুৎ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন ১৫-২৫ বছরের পুরাতন অদক্ষ বিভিন্ন কেন্দ্র রিপিয়ারিং সিম্পল সাইকেল হতে কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৃদ্ধি সম্ভব। কম্বাইন্ড সইকেলে রূপান্তরের অর্থ হল একটি ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রকে একই পরিমান জ্বালানী দিয়ে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। পুরাতন কেন্দ্রগুলো সংস্কার করে ঘোড়াশাল ৫ম ইউনিট ওবারহেলিং ২০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রাম ( রাউজান) এসটি, ২য় ইউঃ ওভারহোলিং ৩০ মেগাওয়াট, ২১০ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ এসটি ওভারহেলিং ৫০ মেগাওয়াট, বড়পুকুড়িয়া এসটি ১ম ইউনিট ওভারহেলিং ( কয়লাভিত্তিক) ৩০ মেগাওয়াট ও কাপ্তাই হাইড্রো পাওয়ার প্লান্ট ( পানি ভিত্তিক) সংস্কার করে ২০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া ঘোড়াশাল ৩য় ইউনিট রিপিয়ারিং, ৪র্থ, ৬ষ্ঠ, ইউনিট রিপিয়ারিং, বাঘাবাড়ি, শাহজিবাজার, সিলেট, সিরাজগঞ্জ, ও খুলনা ১৫০ও ১১০ মেগাওয়াট, ওভারহেলিং করে যথাক্রমে ২৩৬.৩, ২৩৬.৩, ২২৬.৩, ৫০.৩৫, ৭৫, ৭৫, ৭৫ ও ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। রাষ্ট্রীয় খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ খুবই কম। বর্তমানে কম্বাইন্ড সাইকেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ১ টাকা ৩০ পয়সা। ওপেন সাইকেলে ১ টাকা ৪০ পয়সা এবং কাপ্তাই জলবিদ্যুতে খরচ পড়ে মাত্র ২৫ পয়সা। পিডিবির গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে খরচ পড়ে ২ টাকা। সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বন্ধ ইউনিটগুলো সংস্কার করা প্রয়োজন। যে টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তৃকী দেয়া হচ্ছে তার এক দশমাংশ দিয়ে বর্তমানে বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সংস্কার করা হলে সমপরিমান বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। এত ঘন ঘন বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করার প্রয়োজন হতো না। দ্রুত ভাড়ার নামে প্রতি ইউনিট তবে সরকার বিদ্যুৎ উপাদনে অবহেলা করছে না। সরকারি সূত্র মতে, বর্তমানে সরকারিভাবে ৩হাজার ৪৮৮ মেগাওয়াট ও বেসরকারি খাতে ৩ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন ৩৪টি উৎপাদনকেন্দ্রে স্থাপনের কাজ চলছে। এগুলো ২০১৪-১৮ সালের মধ্যে চালু হবে। এর মধ্যে সরকারি ১৪টি এবং বেসরকারি ২০টি উপকেন্দ্র আছে। দ্রুত ভাড়ার নামে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ আট থেকে ১৬ টাকায় কিনে ফি বছর কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে । সরকার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে প্রতি বছর যে অর্থ খরচ করবে তা দিয়ে কমপক্ষে একই ক্ষমতার তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব।
ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিভিন্ন কোম্পানীর বিদ্যুতের দাম বিভিন্ন রকম। এ তথ্যে দেখা যায়, এগ্রিকো ইন্টারন্যশনাল ( যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানী) প্রতি ইউনিটের দাম ধরেছে ১৪.৪০ টাকা, এ কোম্পানীটি ডিজেলভিত্তিক উৎপাদন কেন্দ্র। অন্য দিকে সামিট পাওয়ার ফার্নেস ওয়েল ভিত্তিক উৎপাদন কেন্দ্র। এটি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য দাম নিচ্ছে ৭.৬৯ টাকা। কোন ধরণের কাঁচামাল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ কম পড়বে সেটি আমাদেরকে বিবেচনা করতে হবে।বাংলাদেশে পানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে খরচ খুবই কম পড়ে। গ্যাসের মাধ্যমেও তুলনামূলকবাবে খরচ কম।তারপরও রহস্যজনকবাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কম নির্মান করা হচ্ছে। এক পরিসংখানে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থ বছরে ৮৪% , ১০-১১তে ৭৪% , ১১-১২ তে ৬৭% , ১২-১৩তে ৬৭% , এবং ১৩-১৪ তে মাত্র ৬৩% গ্যাস ব্যবহার করা হয়। সরকার বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ছাড়াও কয়লা, ডিজেল, ফার্নেস ওয়েল, ডুয়েল ফুয়েল, নবায়নযোগ্য জ্বালানী ও নিউক্লিয়ার এনার্জি ব্যবহার করছে। সরকার বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করছে। জনস্বার্থের কথা চিন্তা করেই এ ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় লোকসান বাড়ছে। এছাড়া বিদ্যুতের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত কোনভাবেই বেসরকারি খাতের উপর নির্ভরশীল হওয়া মোটেও শুভ লক্ষন নয়। কনজুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ( ক্যাব) জ্বালানী উপদেষ্টা ডঃ এম শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ায় বিদ্যুৎ মূল্যের নিরাপত্তা হুমকীর সম্মুখীন। বেসরকারি কোম্পানীগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা কৌশলে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে ।আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা ভাড়াভিত্তিক কোম্পানীগুলোকে ডিজেলে ১০ টাকা আর ফার্নেস তেলে ৭ টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু সরকার সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ডিজেল ও ফার্নেস তেলে নতুন ভাড়াভিত্তিক কোম্পানীগুলো থেকে সরকার প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ কিনবে যথাক্রমে ১৪ ও ১৮ টাকায়। পিডিবির ব্যায়ের ৬৪ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে খরচ হওয়ার কথা থাকলেও এখন তার চেয়ে বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশ শিগ্রই মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। এজন্য বিদ্যুৎখাত সমৃদ্ধ হতে হবে এবং জ্বালানী খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জনসাধারণকে সহনীয় মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে যা বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে না এলে শিল্পের উৎপাদন ব্যায় বেড়ে যাবে। ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি ও বেড়ে যাবে। পাশপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিল্প কারখানাও মূল্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগীতা হারাবে। এতে রফতানি আয় কমবে। সব মিলিয়ে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। লেখকঃরাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক ও সাংবাদিক, কুমিল্লা। সধসরহসড়ষষধয@ুধযড়ড়.পড়স