মমিনুল ইসলাম মোল্লা
কিছু কৃতি, কিছু স্মৃতি
কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ঐতিহাসিক এলাহাবাদ গ্রাম থেকে উঠে আসা এক চিন্তাশীল মানুষ মমিনুল ইসলাম মোল্লা। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও লেখালেখি—এই তিন ধারার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর দীর্ঘ পথচলা। প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি কলমকে সঙ্গী করে সমাজ, ইতিহাস, ধর্ম ও মানুষের কথা বলে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবনেই তাঁর জীবনে গড়ে ওঠে সংগ্রামের ভিত। ষষ্ঠ শ্রেণিতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ইংরেজিতে ফেল করার ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রধান শিক্ষকের কঠোর কিন্তু দূরদর্শী উপদেশ তাঁকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সেই দিন থেকেই লেখাপড়ার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পেরিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
শিক্ষকতা তাঁর পেশা হলেও সাংবাদিকতা তাঁর নেশা। ১৯৯০ সালে খুলনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক গ্রামাঞ্চল পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। স্থানীয় সংবাদ দিয়ে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ফিচার ও কলাম লেখায় নিজস্ব স্বাক্ষর রাখেন। সময়ের প্রয়োজনে তিনি প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়িয়ে অনলাইন সাংবাদিকতায় সক্রিয় হন। শতাধিক পত্রিকায় লেখা প্রকাশ—এ যেন তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের এক অনন্য ‘সেঞ্চুরি’।
লেখালেখির ক্ষেত্রেও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে নানা স্মরণীয় অর্জন। অষ্টম শ্রেণিতে ২৬ মার্চ উপলক্ষে প্রথম কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে সাহিত্যচর্চার শুরু। একসময় কবিতার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিনশতে। গল্প, ফিচার, গবেষণা ও কলাম—সব ক্ষেত্রেই তিনি সমান স্বচ্ছন্দ। ‘আমেনা ও তার তিন সন্তান’ গল্পটি পাঠকমহলে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। তাঁর লেখায় উঠে আসে গ্রামীণ সমাজ, নারী, শিক্ষা, অর্থনীতি, স্থানীয় সরকার ও মানবিক মূল্যবোধের নানা দিক।
গবেষণার ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর কৃতি। মুরাদনগর উপজেলার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখা এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ বাংলাদেশ-এ স্থান পেয়েছে। এছাড়া ‘মহেশপুর গণহত্যা’ নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি সনদ লাভ করেন। এসব কাজ তাঁকে শুধু লেখক নয়, একজন দায়বদ্ধ গবেষক হিসেবেও পরিচিত করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পারিবারিক মানুষ। স্ত্রী ও সন্তানদের অব্যক্ত ত্যাগ ও সহযোগিতাকেই তিনি নিজের সাফল্যের অংশ মনে করেন। তাঁর বিশ্বাস—লেখালেখি কখনোই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; বরং পরিবারই লেখকের শক্তির মূল উৎস।
মমিনুল ইসলাম মোল্লার জীবন তাই শুধু কৃতির গল্প নয়, স্মৃতিরও দলিল। সংগ্রাম, সাধনা আর দায়বদ্ধ কলমের এই পথচলা আগামী প্রজন্মের সাংবাদিক ও লেখকদের জন্য নিঃসন্দেহে এক অনুপ্রেরণার নাম।
