আমের রসে ভেজা রঙ্গিন শৈশব

 


আমে-ভেজা শৈশবের দিনগুলো আজ ও মনে পড়ে। আমার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে। নব্বইয়ের দশকের সেই গ্রাম ছিল নিভৃত, সবুজ আর ফলের গন্ধে ভরা। আশপাশে কোনো বাজার ছিল না; বাজারের প্রয়োজনও তেমন অনুভূত হতো না। কারণ প্রায় প্রতিটি বাড়ির উঠোনে আম, জাম, নারকেল, বড়ই, পেয়ারা, কামরাঙ্গার গাছ আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকত। ফল ছিল প্রকৃতির দান, বাজারের পণ্য নয়।

আমাদের গ্রামে তখন রেইন্ট্রি, মেহগনি কিংবা এমন কোনো কাঠের গাছ লাগানোর চল ছিল না, যেগুলো আশপাশের ফলগাছের ক্ষতি করে। বড় বড় দেশি জাতের আমগাছ ছিল গ্রামের অহংকার। কোনো বাড়িতে বড় আমগাছ থাকলে সেটি কাটা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়ি ভাগাভাগি হলেও সেই আমগাছগুলো সবাই মিলে যৌথভাবে ভোগ করতাম। পাকা আম কুড়ানোর মৌসুমে আমরা রাতে আমগাছের নিচে শুয়ে থাকতাম—যেন আম পড়ে, আর আমরা জেগে থাকি।

জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ। তখন কেউ আম বাজার থেকে কিনত না। বরং আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলে সঙ্গে করে আম নেওয়াটাই ছিল নিয়ম। বিশেষ করে যেসব কন্যাদের বিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের শ্বশুরবাড়িতে আম পাঠানো হতো গর্বের সঙ্গে—যদিও সেখানেও আমগাছের অভাব ছিল না। আম তখন শুধু ফল নয়, ছিল সম্পর্কের ভাষা।

আমরা আমগাছের যত্ন নিতাম সন্তানের মতো। মুকুল এলে গাছের গোড়ায় পানি দিতাম। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা রাতে দা দিয়ে আমগাছের গায়ে হালকা কোপ দিতাম, তারপর ধানের নাড়া বেঁধে দিতাম। বিশ্বাস ছিল, এতে আম বেশি ধরবে। তখন গাছের সঙ্গে কথাও বলতাম—

“আম গাছ, তোকে কেটে ফেলবো।”

অন্যজন বলত, “কাটিস না, কাটিস না—তোকে আমি আম দেবো।”

এই কথোপকথনের মধ্যেই ছিল আমাদের সরল বিশ্বাস আর প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তা।

আমাদের বাড়িতে অনেক আমগাছ ছিল, আর প্রতিটি গাছের আলাদা নাম। শক্ত জাতের আমগাছ ছিল “লোহা আম”, আবার ছিল “কলাবতী”, “পুকুরপাড়ের আম”, “কবরস্থানের আম”, “ঘরের পেছনের আম”। আমার ভাইয়েরা কেউ গাছে উঠতে পারত না; আমি একাই সব গাছে চড়তাম। পাকা আম পাড়তাম নিখুঁত দক্ষতায়। আম্মা হাসতে হাসতে বলতেন, “তুই একটা কাঠবিড়ালি—এক গাছ থেকে আরেক গাছে চুল চলে যাস।”

আরেকটা গোপন স্মৃতি আজও মনে পড়ে। আমি কাঁচা আম পেড়ে ঘরের গাদার নিচে লুকিয়ে রাখতাম। কিছুদিন পর সুযোগ বুঝে চুপিচুপি প্রাইমারি স্কুলে নিয়ে যেতাম। বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খেতাম সেই আম—লবণ-মরিচ ছাড়া, শুধু শৈশবের আনন্দে ভেজানো।

আজ আমার বয়স পঞ্চান্ন। সেই গ্রামে এখন আর আগের মতো আমগাছ নেই। রেইন্ট্রি আর মেহগনির দখলে অনেক উঠোন। ফলে ফলের গাছ হারিয়েছে জায়গা, আর আম হারিয়েছে তার সামাজিক মর্যাদা। এখন আত্মীয়ের বাড়িতে যেতে হলে আম নয়, বাজারের বিদেশি ফল নিয়ে যাই। তবু চোখ বন্ধ করলে আজও দেখি—এলাহাবাদের সেই আমগাছ, জ্যৈষ্ঠের রোদ, আর কাঠবিড়ালির মতো গাছে চড়া এক শৈশব, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।

লেখক পরিচিতি -মমিনুল ইসলাম মোল্লা , সাংবাদিক, শিক্ষক ও স্মৃতি কথা বিষয়ক লেখক কুমিল্লা।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.