✊সমবায়ীদের
পথপ্রদর্শক কুমিল্লার দেবিদ্ধারের রফিউদ্দিন আহমেদ আর নেই। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে
তিনি ১৫ ফেব্র“ ‘য়ারি ২০১১ তিনি ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তিনি
দেবিদ্ধারসহ দেশের বহু যায়গায় সমবায় সমিতি
প্রতিষ্ঠা ও সমবায়ীদের স্বাবলম্বী করার উদ্দোগ নিয়েছিলেন।
জন্মঃ রফিউদ্দিন আহমেদ ১৯৩১ সালে মুরাদনগরের
গান্দ্রা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৃত মুন্সি আব্দুল গনি।
শিক্ষাঃ তিনি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নের
মাধ্যমে শিক্ষা জিবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বাঁশকাইট হাইস্কুলে ভর্তি হন। বাড়িতে লেখাপড়ার
ভাল পরিবেশ না থাকায় তিনি যায়গীরে অবস্থান করে লেখাপড়া করেন। ১৯৪৭ সালে তিনি কলকাতা
ইউনিভার্সিটির অধীনে পরীক্ষা দিয়ে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন।
কর্ম জীবনঃ ১৯৪৯ সালে তিনি মাত্র ২৫ টাকা বেতনে
কুমিল্লা সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকে সুপারভাইজার পদে যোগদান করেন। তিনি মনে প্রাণে
সমবায়ী ছিলেন। তাই পরবতীতে ভাল চাকুরির সুযোগ পেলেও সমবায় ত্যাগ করেননি।
প্রশিক্ষণঃ
জনাব রফিউদ্দিন কর্তব্যনিষ্ঠ, মনযোগী ও দায়িত্বশীল ছিলেন। ১৯৫১ সালে তিনি সফলভাবে বিভাগীয়
প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে কাজের
প্রৃতি আরো মনযোগী হয়ে উঠেন। তিনি বাসায়
বসেও অফিসের অতিরিক্ত কাজ করতেন।
কর্মকুশলতাঃ রফিউদ্দিন অন্যান্য অফিসারদের
কাজের দুর্বলতা, ঋণ আদায়ে ব্যার্থতার কারণ অনুসন্ধান করে ি এগুলো নিরসনের উদ্যোগ নেন।
নিজের আরাম-আয়েশের প্রতি খেয়াল না রেখে কৃষকদের স্বার্থে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
প্রমোশনঃ তিনি সুপারভাইজার পদে চাকুরি শুরু
করেন। ১৯৫৬ সালেসহকারী অডিটর পদে প্রমোশন লাভ করেন। ১৯৬০সালে সহকারী পরিদর্শক পদে উন্নীত হন। সাবডিভিশনাল
ইনস্পেক্টর হয়ে ১৯৬৬ সালে দেবিদ্ধার থেকে চলে যান মৌলভীবাজার। এছাড়া ১৯৮৩ সালে হন অডিটর
, ১৯৮৪ সালে উপসহকারী রেজিস্টার পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
দেবিদ্ধারে সমবায়ের প্রসারঃ রফিউদ্দিন আহমেদ
সুপারভাইজার পদে থেকে প্রমোশন পেয়ে চাঁদপুর থেকে ১৯৬০ সালে চলে আসেন দেবিদ্ধার।এখানে
এসে সহকারী পরিদশকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দেবিদ্ধারের ৭টি ইউনিয়ন বহুমুখী সমবায়
সমিতিকে উন্নয়ন স্কীমের আওতায় এনে অফিস কাম গুদামঘর নির্মাণ করেন। দেবিদ্ধারের প্রাচীন
সমিতি দেবিদ্ধার ইউনিয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির উন্নয়নে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন।
বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনঃ তিনি সমবায় বিভাগের
একজন কর্মকর্তা হিসেবে দেশের বিভিন্ন যায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন। তখনকার দিনে যাতায়াত
ব্যবস্থা ভাল ছিলনা। তিনি সকল প্রকার প্রতিকু’লতার দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ফরিদপুর, মাদারিপুর, হবিগঞ্জ, কক্রবাজার
, চাাঁদপুর, ও সুনামগঞ্জসহ বহু যায়গার মাঠে-ঘাটে,অলিতে-গলিতে ঘুরাঘুরি করেছেন। যেখানেই
গিয়েছেন সেখানকার মানুষদের মন জয় করেছেন।
সার্টিফিকেট লাভঃ তার সহযোগী ও বন্ধুদের মতে
রফিউদ্দিন ছিলেন একজন কর্মপাগল মানুষ, । তিনি কখনও অফিসের কাজকে ছোট করে দেখতেন না।
ফলে অন্যান্য অফিসারদের তুলনায় তিনি দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেছেন।তিনি সর্বপ্রথম ”দি
ইস্ট পাকিস্তান প্রভিন্সিয়াল কোঅপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড থেকে সার্টিফিকিট লাভ করেন।
পদক/পুরস্কারঃ তিনি দীর্ঘ চাকুরি জীবনে বহু
পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৫৬ সালের বণ্যায় সুষ্ঠভাবে রিলিফ বিতরণের জন্য ”গভর্নমেন্ট
অভ ইস্ট পাকিস্টান ডিক্ট্রিস্ট ম্যাজিস্ট্রেট এন্ড কালেক্টর টিপেরা ” কর্তৃক দ্বিতীয়
শ্রেণীর পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে ”দি ইস্ট পাকিস্টান প্রভিন্সিয়াল কো অপারেটিভ
ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে লাভ করেন-সার্টিফিকেট অব মেরিট”একই ধরণের পুরস্কার
পান ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ সালে।
১৯৮২ সালে সার বিক্রয় অভিযানে সাফল্যের স্বীকৃতি
স্বরুপ তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর সফলতার পুরস্কার পান। কর্মজীবনে সাফল্যের সর্বশেষ পুরস্কার
পান ১৯৮৬ সালে। ১৯৮৪-৮৫ অর্থ বছরে ঋণ আদায়ে রেকর্ড র্সষ্টির জন্য তাকে উৎসাহমূলক পুরস্কার
দেয়াহয়। বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাদাত হোসাইন থেকে তিনি এ পদক লাভ করেন।
অবসর গ্রহণঃ প্রতিটি চাকুরিজীবির জন্যই অবসরের
দিনগুলো অপেক্ষা করে। ১৯৪৯ সালে যে টগবগে তরূণটি সেবামুলক মনোভাব নিয়ে সমবায়ীদের পতাকাতলে
শামিল হয়েছিলেন তার বিদায় নেয়ার সময় এগিয়ে আসে। তিনি কুমিল্লা সমবায় অফিস থেকে ১৯৮৮
সালে অবসর গ্রহণ করেন।
হজ্জবব্রত
পালনঃ রফিইদ্দিন ব্যাক্তিগতভাবে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। তিনি সব সময় জামাতে নামাজ
পড়ার চেষ্টা করতেন। তিনি ১৯৯৬ সালে পবিত্র হজ্জ্ব পালন করেন।
মন্ত্রী মফিজ উদ্দীনের সাথে বন্ধুত্বঃ তিনি
একজন বন্ধুভাবাপন্ন লোক ছিলেন। পাকিস্তান আমলের শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দীন অহমদের সাথে
তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল। গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধানন্ত নেয়ার ব্যাপারে মফিজ উদ্দিন
আহমেদ রফিউদ্দিনের পরামর্শ নিতেন।
১৯৪৯ সালে সুপারভাইজার পদে যোগ দিযে ১৯৫৬ সালে
সহকারী অডিটর পদে প্রমোশন লাভ করেন। তখন তিনি প্রমোশনের ব্যাপারটি মন্ত্রী মহোদয়কে
অবগত করেন। মফিজ উদ্দিন আহমেদ তখন পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য। করাচী
থেকেই বন্ধুকে লিখলেন-”ও ধস মষধফ ঃযধঃ ুড়ঁ যধাব মড়ঃ ধ ঢ়ৎড়সড়ঃরড়হ ধহফ ও পড়হমৎধঃঁষধঃব
ুড়ঁ ড়হ ঃযব ংঁপপবংং.”
সমবায়ের পথপ্রদর্শকঃ তিনি বহু এলাকায় পথ প্রদর্শক
হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে বিভিন্ন এনজিও কৃষকদের ঋণ দিলেও তখন সমবায়ই ছিল একমাত্র
প্রতিষ্ঠান । তিনি শুধু ঋণ দিয়েই ক্ষান্ত থাকতেন না, আয় থেকে কিভাবে দায় শোধ করা যায়-সে
পথও তাদের দেখিয়ে দিতেন। ফলে সমবায়ী কৃষকগণ তাকে ভালবাসতেন।
পারিবারিক জীবনঃ তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের
মাসে দেবিদ্ধারের ভীরাল্লা গ্রামের আনোয়ারা বেগমকে বিয়ে করেন। তার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা
রফিউদ্দিনের জীবনকে আরো গতিশীল করে তোলে। তার তিন ছেলে রূহূল আমিন, আবুল কাশেম, ও আবদুল
কাইয়ুম এবং ১ মেয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করে স্ব স্ব পেশায় প্রতিষ্ঠিত।
মৃত্যুর পূর্বে এই প্রতিনিধির সাথে এক সাক্ষাৎকারে
তিনি বলেছিলেন- সকলে যখন ঘুমাত আমি তখন কাজ করতাম। রাতেই আমি নির্দিষ্ট এরাকায় গিয়ে
বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের সােেথ আলাপ আলোাচনা করে নিতাম। ফলে ঋণ আদায় সহজ হতো” বিশিষ্ট সমবায়
কর্মকর্তা রফিউদ্দিন আহমেদ মৃত্যুবরণ করলেও তার কীর্তি দীর্ঘ দিন টিকে থাকবেএবং তিনি
আমাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।
মমিনুল
ইসলাম মোল্লা
15 02 2020
