প্রিয়জনের মৃত্যুর পর ১০ টি কাজ
মমিনুল ইসলাম মোল্লা
আমাদের আপনজন কেউ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজনকে খবর দেয়া থেকে শুরু করে কম-বেশি দশটি কাজ করতে হয়। এগুলো আমরা কোরান ও সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক করা উচিত।
তালকিন দেয়াঃ কোন ব্যক্তির মৃত্যু আসন্ন হলে তাকে কালেমা তাইয়েবার তালকিন দাও। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের মৃতদেরকে “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু” শিক্ষা দাও”-মুসলিম।এই হাদীসে মৃতদের বলতে ঐ সব মরণাপন্ন লোকদের কথা বলা হয়েছে যাদের উপর মৃত্যুর লক্ষণাদি ষ্পষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
মাইয়েতের যত্ন নেয়াঃ কোন মুসলিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তার চক্ষুদ্বয় মুদিত এবং দাড়ি বেঁধে রাখতে হয়।
নখ-চুল না কাটাঃমারা যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তির চুল-নখ কাটা উচিত নয়। ঐভাবেই দাফন করতে হবে। মৃত ব্যক্তিকে গোসলের পূর্বে কুলুখ করানো, খিলাল করা, পেট টিপে ও উঠা বসা করিয়ে ময়লা বের করা যাবে না। এ সমস্ত কুসংস্কার থেকে সাবধান থাকতে হবে।
গোসল দেয়াঃমৃতকে গোসল দেওয়া ফরযে কেফায়াহ।
তবে যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর শহীদের গোসল করানো হয় না, না তাঁর উপর জানাজার নামাজ পড়া হয়; বরং তার পরিহিত বস্ত্রেই তাকে দাফন করা হয়। কেননা, রাসূল (ﷺ) উহুদের যুদ্ধে মৃতদের গোসল করাননি এবং তাদের উপর নামাজও পড়েননি। স্ত্রী স্বামীকে গোসল দিতে পারবে। আসমা বিনতে উমাইস ( বলেন, আমি এবং আলী রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা ফাতেমাকে গোসল দিয়েছি। অন্য দিকে আয়েশা ( বলেন, لَوِ اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِىْ مَا اسْتَدْبَرْتُ مَا غَسَّلَهُ إِلاَّ نِسَاؤُهُ ‘পরে যা জানলাম তা যদি আগে জানতাম, তবে রাসূল (ﷺ)-কে তাঁর স্ত্রীরা ছাড়া কেউ গোসল দিতে পারত না’।অতএব স্বামী আগে মারা গেলে স্ত্রী, কিংবা স্ত্রী আগে মারা গেলে স্বামী উভয় উভয়কে গোসল দেয়ার বেশী হকদার।
স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এ কাজটি করবেন এবং বিনিময়ে দুনিয়াবী কিছুই গ্রহণ না করেনা’ (কাহফ ১৮/১১০)। দুই- যদি তিনি মাইয়েতের কোন অপসন্দীয় বিষয় গোপন রাখেন।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলিম মাইয়েতকে গোসল করালো। অতঃপর তার গোপনীয়তাসমূহ গোপন রাখলো, আল্লাহ তাকে চল্লিশ বার ক্ষমা করবেন।
কাফন পড়ানোঃ
শহীদকে তার পরিহিত পোষাকে এবং মুহরিমকে তার ইহরামের দু’টি কাপড়েই কাফন দিবে। কাফনের কাপড়ের অভাব ঘটলে এক কাফনে একাধিক মাইয়েতকে কাফন দেওয়া যাবে। কাফনের পরে তিনবার সুগন্ধি ছিটাবে। তবে মুহরিমের কাফনে সুগন্ধি ছিটানো যাবে না। মাইয়েতের নিজস্ব সম্পদ না থাকলে কিংবা তাতে কাফনের ব্যবস্থা না হ’লে কেউ দান করবে অথবা বায়তুল মাল থেকে বা সরকারী তহবিল থেকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। সাদা বর্ণের তিনখানা কাপড়ে পুরুষের কাফন দেওয়া উত্তম। জামা বা পাগড়ী এ্রর অন্তর্ভূক্ত নয়। এইভাবে রাসূল (ﷺ) এ্রর কাফন দেয়া হয়েছিল। মৃতকে এর ভিতরে পর্যায়ক্রমে রাখা হয়। একটা জামা, একটা ইজার ও একটা লেফাফার দ্বারা কাফন দিলেও চলে। তিন কাপড়ে কাফন দেয়ার সহিহ হাদীছ :
✔ عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْها أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ كُفِّنَ فِىْ ثَلاَثَةِ أَثْوَابٍ لَيْسَ فِيْهَا قَمِيْصٌ وَلاَ عِمَامَةٌ .
আয়েশা থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ)-কে তিনটি কাপড়ে কাফন দেয়া হয়েছিল। তাতে জামা এবং পাগড়ী ছিল না।
অতএব পুরুষ নারী উভয়কে তিন কাপড়ে কাফন দিতে হবে। এর বেশী নয়। একই এলাকার একাধিক মসজিদে জানাযা পড়ানোর জন্য মৃত ব্যক্তিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করার নিয়ম নেই। অতএব, জানাযা পড়ার জন্য মৃত ব্যক্তির নিকটে যেতে হবে; তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে না।
অসিয়ত পূরণ করাঃ
রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহে সাল্লাম এর কাছে যখন তাঁর কাছে কোনো মাইয়্যেত আনা হতো, তখন তিনি তার ঋণ পরিশোধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন।তার উপর কোনো ঋণ না থাকলে জানাযার স্বলাত পড়তেন, নচেৎ তিনি নিজে তার উপর জানাযার স্বলাত পড়তেন না, সাহাবীদেরকে পড়ার নির্দেশ দিতেন।
জানাযা পড়াঃ
মৃত ব্যক্তির জানাযা না কোথাও না পড়া হলে সেক্ষেত্রে তার গায়েবানা জানাযা পড়া যায়; যেমনটি রাসূল (ﷺ) নাজাশীর গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে দেশপ্রধান গায়েবানা জানাযার আদেশ করলে পড়া যেতে পারে। কেননা ইজতেহাদী কোন বিষয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের অবাধ্য হওয়া উচিৎ নয়। অসম্পূর্ণ সন্তানকে রূহ প্রদানের আগেই সে গর্ভচ্যুত হলে তার জানাযা পড়তে হবে না। উল্লেখ্য যে, গর্ভধারণের চার মাসে রূহ বা আত্মা প্রদান করা হয়।
দাফন করাঃ যে ব্যক্তি মাইয়েতের জন্য কবর খনন করল, অতঃপর দাফন শেষে তা ঢেকে দিল, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত পুরস্কার দিবেন জান্নাতের একটি বাড়ীর সমপরিমাণ, যেখানে আল্লাহ তাকে রাখবেন। যে ব্যক্তি মাইয়েতকে কাফন পরাবে, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের মিহি ও মোটা রেশমের পোষাক পরাবেন’।
ইবনু জুরাইজ বলেন, আমাকে আবু যুবায়ের জানিয়েছেন যে, তিনি জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ কে বর্ণনা করতে শুনেছেন, একদিন মহানবী রাসুলুল্লাহ (ﷺ) খুতবা দিতে গিয়ে তাঁর সাহাবীদের মধ্যে এক ব্যক্তির উল্লেখ করলেন। তিনি মারা গেলে তাকে অপর্যাপ্ত কাপড়ে কাফন দেয়া হয় ও রাত্রিবেলা দাফন দেয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে এই বলে তিরস্কার করলেন যে, কেন তাকে রাত্রিবেলা দাফন দেয়া হল? অথচ তিঁনি তাঁর জানাযা পড়তে পারলেননা? কোন মানুষ নিরুপায় না হলে এরুপ করা ঠিক না। মৃতের দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা সুন্নাত পরিপন্থী এবং রাসূল (ﷺ)-এর আদেশ বিরোধী। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা তাড়াতাড়ি মৃত ব্যক্তির দাফনকার্য সম্পন্ন করো। কেননা সে যদি পূণ্যবান হয়, তাহলে তার জন্য উত্তম পরিণতি রয়েছে, তাকে তোমরা কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছ। আর যদি সে এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে তার জন্য খারাপ রয়েছে, যাকে তোমরা তোমাদের কাঁধ থেকে (তাড়াতড়ি) নামিয়ে দিচ্ছ।শরীয়ত মতে কবর একজন পরুষের মধ্যভাগ পরিমাণ গভীর এবং কেবলার দিক দিয়ে লহদ (বগলী কবর) আকারে করতে হবে। মৃতকে তার ডান পার্শ্বের উপর সামান্য কাত করে লাহাদে শায়িত করবে। তারপর কাফনের গাঁইট খুলে দিবে, তবে কাপড় খুলবে না, বরং এইভাবেই ছেড়ে দিবে। তারপর এর উপর মাটি ফেলা হবে এবং এই মাটি ফেলার সময়:
«بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ»
(আল্লাহর নামে এবং রাসূল (ﷺ) এর দ্বীনের উপর রাখলাম) বলা মুস্তাহাব। কবর এক বিঘত পরিমাণ উচু করবে এবং এর উপরে সম্ভব হলে কঙ্কর রেকে পানি ছিটিয়ে
কাযা জানাজাঃ দাফনের পূর্বে যে মৃত্যের উপর নামাজ পড়ে নাই সে দাফনের পর নামাজ পড়তে পারে। কেনন, নবী করীম (ﷺ) তা করেছেন। তবে এই নামাজ একমাস সময়ের মধ্যে হতে হবে, এর বেশী হলে কবরের উপর নামাজ পড়া বৈধ হবে না। কেননা, দাফনের একমাস পর রাসুল (ﷺ) কোন মৃতের উপর নামাজ পড়েছেন এমন কোন হাদীস পাওয়া যায় নাই।যদি দাফনের পূর্বে তাদের পক্ষে জানাযা পড়া সম্ভব হয়, তাহলে পড়বে। কিন্তু দাফনের পরে তারা আসলে ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযা পড়ে নিবে। কেননা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযা পড়েছেন মর্মে প্রমাণিত হয়েছে।সূত্রঃ ছহীহ বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হাদিছ/৪৫৮; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হাদিছ/৯৫৬ দ্রষ্টব্য।
দোয়া ও লোক খাওয়ানোঃ উপস্থিত লোকদের জন্য মৃত্যের পরিবার-পরিজনের পক্ষে খাদ্য প্রস্তুত করা জায়েজ নয়। প্রসিদ্ধ সাহাবী হজরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালী (রা) বলেন: “মৃত্যের পরিবার-পরিজনের নিকট সমবেত হওয়া এবং দাফনের পর খাদ্য প্রস্তুত করাকে আমরা মৃত্যের উপর ‘নিয়াহা’ (বিলাপ) বলে গণ্য করতাম।” (এই হাদীস ইমাম আহমদ উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।)
শোক প্রকাশ করাঃ নবি করিম ( সাঃ )এর ছেলে ইবরাহীমের মৃত্যুতে তিনি বাথিত হন। তিনি বলেন: “চক্ষু অশ্রুসিক্ত এবং অন্তর দুঃখিত, কিন্তু মুখে শুধু এমন কথাই বলব, যাতে প্রভু হন সন্তুষ্ট।”কোন স্ত্রীলোকের পক্ষে স্বামী ব্যতীত অপর কোন মৃত্যের উপর তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ জায়েজ নয়। স্ত্রীলোকের পক্ষে স্বামীর উপর চারমাস দশ দিন পর্যন্ত শোক প্রকাশ ওয়াজিব। শোভাবর্ধক সুন্দর কোনো পোশাক পরিধান করবে না। কেননা নবী (ﷺ) এমন পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন। উম্মে আত্বিইয়াহ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাদিছ) বর্ণিত উল্লেখিত হাদিছদীছে এসেছে, ‘আমাদেরকে রঙীন কাপড় পরতে নিষেধ করা হত। তবে এক ধরনের ডোরা-কাটা পোষাক পরার অনুমতি দেওয়া হত’।ফলে সে কোনো রকম সাজসজ্জা ছাড়াই ঐ জাতীয় সাধারণ পোশাক পরবে, বাড়িতে স্বাভাবিক যেসব পোশাক পরা হয়।
কবর যিয়ারতঃ সময়ে সময়ে পুরুষদের পক্ষে কবর জিয়ারত করা সুন্নাত এবং এর উদ্দেশ্য হবে মৃতদের জন্য দু’আ, রহমাত কামনা, মরণ এবং মরনোত্তর অবস্থা স্মরণ করা। রাসূল (ﷺ) বলেন, “তোমরা কবর জিয়ারত কর, কেননা, উহা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে”।জিয়ারতের সময় দোয়া পড়বে ।
অর্থ: “তোমাদের প্রতি সালাম হোক হে কবরবাসী মু’মিন-মসলমানগণ, ইনশা আল্লাহ আমরাও অবশ্যই তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি, আমরা আমাদের এবং তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর নিকট শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করিছি। আল্লাহ অগ্রগামী পশ্চাতগামী আমাদের সবার প্রতি দয়া করুন।”মেয়ে লোকের পক্ষে কবর জিয়ারত বৈধ নহে। কেননা, রাসূল (ﷺ) কবর জিয়ারতকারীনী নারীদের অভিশাপ করেছেন। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা,প্রভাষক, সাংবাদিক ও গবেষক।
মমিনুল ইসলাম মোল্লা
আমাদের আপনজন কেউ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজনকে খবর দেয়া থেকে শুরু করে কম-বেশি দশটি কাজ করতে হয়। এগুলো আমরা কোরান ও সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক করা উচিত।
তালকিন দেয়াঃ কোন ব্যক্তির মৃত্যু আসন্ন হলে তাকে কালেমা তাইয়েবার তালকিন দাও। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের মৃতদেরকে “লাইলাহা ইল্লাল্লাহু” শিক্ষা দাও”-মুসলিম।এই হাদীসে মৃতদের বলতে ঐ সব মরণাপন্ন লোকদের কথা বলা হয়েছে যাদের উপর মৃত্যুর লক্ষণাদি ষ্পষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
মাইয়েতের যত্ন নেয়াঃ কোন মুসলিমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তার চক্ষুদ্বয় মুদিত এবং দাড়ি বেঁধে রাখতে হয়।
নখ-চুল না কাটাঃমারা যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তির চুল-নখ কাটা উচিত নয়। ঐভাবেই দাফন করতে হবে। মৃত ব্যক্তিকে গোসলের পূর্বে কুলুখ করানো, খিলাল করা, পেট টিপে ও উঠা বসা করিয়ে ময়লা বের করা যাবে না। এ সমস্ত কুসংস্কার থেকে সাবধান থাকতে হবে।
গোসল দেয়াঃমৃতকে গোসল দেওয়া ফরযে কেফায়াহ।
তবে যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর শহীদের গোসল করানো হয় না, না তাঁর উপর জানাজার নামাজ পড়া হয়; বরং তার পরিহিত বস্ত্রেই তাকে দাফন করা হয়। কেননা, রাসূল (ﷺ) উহুদের যুদ্ধে মৃতদের গোসল করাননি এবং তাদের উপর নামাজও পড়েননি। স্ত্রী স্বামীকে গোসল দিতে পারবে। আসমা বিনতে উমাইস ( বলেন, আমি এবং আলী রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা ফাতেমাকে গোসল দিয়েছি। অন্য দিকে আয়েশা ( বলেন, لَوِ اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِىْ مَا اسْتَدْبَرْتُ مَا غَسَّلَهُ إِلاَّ نِسَاؤُهُ ‘পরে যা জানলাম তা যদি আগে জানতাম, তবে রাসূল (ﷺ)-কে তাঁর স্ত্রীরা ছাড়া কেউ গোসল দিতে পারত না’।অতএব স্বামী আগে মারা গেলে স্ত্রী, কিংবা স্ত্রী আগে মারা গেলে স্বামী উভয় উভয়কে গোসল দেয়ার বেশী হকদার।
স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এ কাজটি করবেন এবং বিনিময়ে দুনিয়াবী কিছুই গ্রহণ না করেনা’ (কাহফ ১৮/১১০)। দুই- যদি তিনি মাইয়েতের কোন অপসন্দীয় বিষয় গোপন রাখেন।রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলিম মাইয়েতকে গোসল করালো। অতঃপর তার গোপনীয়তাসমূহ গোপন রাখলো, আল্লাহ তাকে চল্লিশ বার ক্ষমা করবেন।
কাফন পড়ানোঃ
শহীদকে তার পরিহিত পোষাকে এবং মুহরিমকে তার ইহরামের দু’টি কাপড়েই কাফন দিবে। কাফনের কাপড়ের অভাব ঘটলে এক কাফনে একাধিক মাইয়েতকে কাফন দেওয়া যাবে। কাফনের পরে তিনবার সুগন্ধি ছিটাবে। তবে মুহরিমের কাফনে সুগন্ধি ছিটানো যাবে না। মাইয়েতের নিজস্ব সম্পদ না থাকলে কিংবা তাতে কাফনের ব্যবস্থা না হ’লে কেউ দান করবে অথবা বায়তুল মাল থেকে বা সরকারী তহবিল থেকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। সাদা বর্ণের তিনখানা কাপড়ে পুরুষের কাফন দেওয়া উত্তম। জামা বা পাগড়ী এ্রর অন্তর্ভূক্ত নয়। এইভাবে রাসূল (ﷺ) এ্রর কাফন দেয়া হয়েছিল। মৃতকে এর ভিতরে পর্যায়ক্রমে রাখা হয়। একটা জামা, একটা ইজার ও একটা লেফাফার দ্বারা কাফন দিলেও চলে। তিন কাপড়ে কাফন দেয়ার সহিহ হাদীছ :
✔ عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْها أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ كُفِّنَ فِىْ ثَلاَثَةِ أَثْوَابٍ لَيْسَ فِيْهَا قَمِيْصٌ وَلاَ عِمَامَةٌ .
আয়েশা থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ)-কে তিনটি কাপড়ে কাফন দেয়া হয়েছিল। তাতে জামা এবং পাগড়ী ছিল না।
অতএব পুরুষ নারী উভয়কে তিন কাপড়ে কাফন দিতে হবে। এর বেশী নয়। একই এলাকার একাধিক মসজিদে জানাযা পড়ানোর জন্য মৃত ব্যক্তিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করার নিয়ম নেই। অতএব, জানাযা পড়ার জন্য মৃত ব্যক্তির নিকটে যেতে হবে; তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে না।
অসিয়ত পূরণ করাঃ
রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহে সাল্লাম এর কাছে যখন তাঁর কাছে কোনো মাইয়্যেত আনা হতো, তখন তিনি তার ঋণ পরিশোধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন।তার উপর কোনো ঋণ না থাকলে জানাযার স্বলাত পড়তেন, নচেৎ তিনি নিজে তার উপর জানাযার স্বলাত পড়তেন না, সাহাবীদেরকে পড়ার নির্দেশ দিতেন।
জানাযা পড়াঃ
মৃত ব্যক্তির জানাযা না কোথাও না পড়া হলে সেক্ষেত্রে তার গায়েবানা জানাযা পড়া যায়; যেমনটি রাসূল (ﷺ) নাজাশীর গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন। অনুরূপভাবে দেশপ্রধান গায়েবানা জানাযার আদেশ করলে পড়া যেতে পারে। কেননা ইজতেহাদী কোন বিষয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের অবাধ্য হওয়া উচিৎ নয়। অসম্পূর্ণ সন্তানকে রূহ প্রদানের আগেই সে গর্ভচ্যুত হলে তার জানাযা পড়তে হবে না। উল্লেখ্য যে, গর্ভধারণের চার মাসে রূহ বা আত্মা প্রদান করা হয়।
দাফন করাঃ যে ব্যক্তি মাইয়েতের জন্য কবর খনন করল, অতঃপর দাফন শেষে তা ঢেকে দিল, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত পুরস্কার দিবেন জান্নাতের একটি বাড়ীর সমপরিমাণ, যেখানে আল্লাহ তাকে রাখবেন। যে ব্যক্তি মাইয়েতকে কাফন পরাবে, আল্লাহ তাকে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের মিহি ও মোটা রেশমের পোষাক পরাবেন’।
ইবনু জুরাইজ বলেন, আমাকে আবু যুবায়ের জানিয়েছেন যে, তিনি জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ কে বর্ণনা করতে শুনেছেন, একদিন মহানবী রাসুলুল্লাহ (ﷺ) খুতবা দিতে গিয়ে তাঁর সাহাবীদের মধ্যে এক ব্যক্তির উল্লেখ করলেন। তিনি মারা গেলে তাকে অপর্যাপ্ত কাপড়ে কাফন দেয়া হয় ও রাত্রিবেলা দাফন দেয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে এই বলে তিরস্কার করলেন যে, কেন তাকে রাত্রিবেলা দাফন দেয়া হল? অথচ তিঁনি তাঁর জানাযা পড়তে পারলেননা? কোন মানুষ নিরুপায় না হলে এরুপ করা ঠিক না। মৃতের দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা সুন্নাত পরিপন্থী এবং রাসূল (ﷺ)-এর আদেশ বিরোধী। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘তোমরা তাড়াতাড়ি মৃত ব্যক্তির দাফনকার্য সম্পন্ন করো। কেননা সে যদি পূণ্যবান হয়, তাহলে তার জন্য উত্তম পরিণতি রয়েছে, তাকে তোমরা কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছ। আর যদি সে এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে তার জন্য খারাপ রয়েছে, যাকে তোমরা তোমাদের কাঁধ থেকে (তাড়াতড়ি) নামিয়ে দিচ্ছ।শরীয়ত মতে কবর একজন পরুষের মধ্যভাগ পরিমাণ গভীর এবং কেবলার দিক দিয়ে লহদ (বগলী কবর) আকারে করতে হবে। মৃতকে তার ডান পার্শ্বের উপর সামান্য কাত করে লাহাদে শায়িত করবে। তারপর কাফনের গাঁইট খুলে দিবে, তবে কাপড় খুলবে না, বরং এইভাবেই ছেড়ে দিবে। তারপর এর উপর মাটি ফেলা হবে এবং এই মাটি ফেলার সময়:
«بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ»
(আল্লাহর নামে এবং রাসূল (ﷺ) এর দ্বীনের উপর রাখলাম) বলা মুস্তাহাব। কবর এক বিঘত পরিমাণ উচু করবে এবং এর উপরে সম্ভব হলে কঙ্কর রেকে পানি ছিটিয়ে
কাযা জানাজাঃ দাফনের পূর্বে যে মৃত্যের উপর নামাজ পড়ে নাই সে দাফনের পর নামাজ পড়তে পারে। কেনন, নবী করীম (ﷺ) তা করেছেন। তবে এই নামাজ একমাস সময়ের মধ্যে হতে হবে, এর বেশী হলে কবরের উপর নামাজ পড়া বৈধ হবে না। কেননা, দাফনের একমাস পর রাসুল (ﷺ) কোন মৃতের উপর নামাজ পড়েছেন এমন কোন হাদীস পাওয়া যায় নাই।যদি দাফনের পূর্বে তাদের পক্ষে জানাযা পড়া সম্ভব হয়, তাহলে পড়বে। কিন্তু দাফনের পরে তারা আসলে ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযা পড়ে নিবে। কেননা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযা পড়েছেন মর্মে প্রমাণিত হয়েছে।সূত্রঃ ছহীহ বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হাদিছ/৪৫৮; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হাদিছ/৯৫৬ দ্রষ্টব্য।
দোয়া ও লোক খাওয়ানোঃ উপস্থিত লোকদের জন্য মৃত্যের পরিবার-পরিজনের পক্ষে খাদ্য প্রস্তুত করা জায়েজ নয়। প্রসিদ্ধ সাহাবী হজরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ আল-বাজালী (রা) বলেন: “মৃত্যের পরিবার-পরিজনের নিকট সমবেত হওয়া এবং দাফনের পর খাদ্য প্রস্তুত করাকে আমরা মৃত্যের উপর ‘নিয়াহা’ (বিলাপ) বলে গণ্য করতাম।” (এই হাদীস ইমাম আহমদ উত্তম সনদে বর্ণনা করেছেন।)
শোক প্রকাশ করাঃ নবি করিম ( সাঃ )এর ছেলে ইবরাহীমের মৃত্যুতে তিনি বাথিত হন। তিনি বলেন: “চক্ষু অশ্রুসিক্ত এবং অন্তর দুঃখিত, কিন্তু মুখে শুধু এমন কথাই বলব, যাতে প্রভু হন সন্তুষ্ট।”কোন স্ত্রীলোকের পক্ষে স্বামী ব্যতীত অপর কোন মৃত্যের উপর তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ জায়েজ নয়। স্ত্রীলোকের পক্ষে স্বামীর উপর চারমাস দশ দিন পর্যন্ত শোক প্রকাশ ওয়াজিব। শোভাবর্ধক সুন্দর কোনো পোশাক পরিধান করবে না। কেননা নবী (ﷺ) এমন পোশাক পরতে নিষেধ করেছেন। উম্মে আত্বিইয়াহ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাদিছ) বর্ণিত উল্লেখিত হাদিছদীছে এসেছে, ‘আমাদেরকে রঙীন কাপড় পরতে নিষেধ করা হত। তবে এক ধরনের ডোরা-কাটা পোষাক পরার অনুমতি দেওয়া হত’।ফলে সে কোনো রকম সাজসজ্জা ছাড়াই ঐ জাতীয় সাধারণ পোশাক পরবে, বাড়িতে স্বাভাবিক যেসব পোশাক পরা হয়।
কবর যিয়ারতঃ সময়ে সময়ে পুরুষদের পক্ষে কবর জিয়ারত করা সুন্নাত এবং এর উদ্দেশ্য হবে মৃতদের জন্য দু’আ, রহমাত কামনা, মরণ এবং মরনোত্তর অবস্থা স্মরণ করা। রাসূল (ﷺ) বলেন, “তোমরা কবর জিয়ারত কর, কেননা, উহা তোমাদের আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে”।জিয়ারতের সময় দোয়া পড়বে ।
অর্থ: “তোমাদের প্রতি সালাম হোক হে কবরবাসী মু’মিন-মসলমানগণ, ইনশা আল্লাহ আমরাও অবশ্যই তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি, আমরা আমাদের এবং তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর নিকট শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করিছি। আল্লাহ অগ্রগামী পশ্চাতগামী আমাদের সবার প্রতি দয়া করুন।”মেয়ে লোকের পক্ষে কবর জিয়ারত বৈধ নহে। কেননা, রাসূল (ﷺ) কবর জিয়ারতকারীনী নারীদের অভিশাপ করেছেন। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা,প্রভাষক, সাংবাদিক ও গবেষক।