মমিনুল ইসলাম মোল্লা,
পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের আগে আমরা আযান দেই।
আযানের আভিধানিক অর্থ: কোন জিনিস সম্পর্কে ঘোষণা দেয়া, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে আযান”। সূরা তাওবা: (৩) অর্থাৎ ঘোষণা। শরিয়তের পরিভাষায় আযান: “শরিয়ত কর্তৃক অনুমোদিত নির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে স্বলাতের সময় সম্পর্কে ঘোষণা প্রদান করা” মুগনি লি ইব্ন কুদামা: (২/৫৩)।আযানের নাম এ জন্য আযান হয়েছে, যেহেতু মুয়াজ্জিন সাহেব মানুষদেরকে স্বলাতের সময় জানিয়ে দেন ও তার ঘোষণা প্রদান করেন। ১ম হিজরী সনে আযানের প্রচলন হয়।[. মির‘আত ২/৩৪৪-৩৪৫, ‘স্বলাত’ অধ্যায়-৪, ‘আযান’ অনুচ্ছেদ-৪)।ওমর ফারূক রাজিয়াল্লাহু আনহু সহ একদল ছাহাবী একই রাতে আযানের একই স্বপ্ন দেখেন ও পরদিন সকালে ‘অহি’ দ্বারা প্রত্যাদিষ্ট হ’লে রাসূলুল্লাহ তা সত্যায়ন করেন এবং বেলাল .রাজিয়াল্লাহু আনহু -কে সেই মর্মে ‘আযান’ দিতে বলেন। আবুদাঊদ হা/৪৯৯ )আবু সাঈদ খুদরী .রাজিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,لاَ يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ الْمُؤَذِّنِ جِنٌّ وَّلاَ إِنْسٌ وَّ لاَ شَيْئٌ إِلاَّ شَهِدَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ رواه البخاريُّ-আযানের কালেমা সমূহ : ১৫ টি:রমজান মাসে সাহারীর আযান দেওয়া সুন্নাত। তবে রমজান বাদে অন্য সময়ও তা দেয়া যায়।রাসূলুল্লাহ এর যামানায় তাহাজ্জুদ ও সাহারীর আযান বেলাল দিতেন এবং ফজরের আযান অন্ধ ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম .রাজিয়াল্লাহু আনহু দিতেন। তাই রাসূলুল্লাহ বলেন, ‘বেলাল রাত্রি থাকতে আযান দিলে তোমরা (সাহারীর জন্য) খানাপিনা কর, যতক্ষণ না ইবনে উম্মে মাকতূম আযান দেয়। কেননা সে ফজর না হওয়া পর্যন্ত আযান দেয় না’। মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৬৮০, )। রাসুল সাঃ এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি মুওয়ায্যিনের পিছে পিছে আযানের বাক্যগুলি অন্তর থেকে পাঠ করে এবং ‘হাইয়া ‘আলাছ ছালা-হ’ ও ‘ফালা-হ’ শেষে ‘লা-হাওলা অলা-কুবওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ’ (নেই কোন ক্ষমতা, নেই কোন শক্তি আল্লাহ ব্যতীত) বলে, সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। মুসলিম, মিশকাত হা/৬৫৮)। আযানের জওয়াব দান শেষে প্রথমে দরূদ পড়বে।অতঃপর আযানের দো‘আ পড়বে। মুসলিম, মিশকাত হা/৬৫৭) । রাসূলুল্লাহ . এরশাদ করেন ‘যে ব্যক্তি আযান শুনে এই দো‘আ পাঠ করবে, তার জন্য ক্বিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত ওয়াজিব হবে’। বুখারী, মিশকাত হা/৬৫৯ )।
‘মুওয়ায্যিনের আযানের ধ্বনি জিন ও ইনসান সহ যত প্রাণী শুনবে, ক্বিয়ামতের দিন সকলে তার জন্য সাক্ষ্য প্রদান করবে’। বুখারী, মিশকাত হা/৬৫৬ )। ‘আযান ও এক্বামতের ধ্বনি শুনলে শয়তান ছুটে পালিয়ে যায় ও পরে ফিরে আসে’।বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৬৫৫। যে ব্যক্তি বার বছর যাবৎ আযান দিল, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল। তার প্রতি আযানের জন্য ৬০ নেকী ও এক্বামতের জন্য ৩০ নেকী লেখা হয়’। ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৬৭৮)।রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন যে, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুওয়ায্যিনের গর্দান সবচেয়ে উঁচু হবে’। মুসলিম, মিশকাত হা/৬৫৪)। ‘এক্বামত অর্থ দাঁড় করানো। উপস্থিত মুছল্লীদেরকে স্বলাতে দাঁড়িয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারী শুনানোর জন্য ‘এক্বামত’ দিতে হয়। জামা‘আতে হউক বা একাকী হউক সকল অবস্থায় ফরয স্বলাতে আযান ও এক্বামত দেওয়া সুন্নাত। নাসাঈ হা/৬৬৭-৬৮;)। ৮ম হিজরী সনে মক্কা বিজয়ের পর মদীনায় ফিরে এসে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেলালকে মসজিদে নববীতে স্থায়ীভাবে মুওয়ায্যিন নিযুক্ত করেন। ikamot kalimaহযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর বলেনكَانَ الْأَذَانُ عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ وَالْإِقَامَةُ مَرَّةً غَيْرَ أَنَّهُ كَانَ يَقُوْلُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ قَدْ قَامَتِ الصَّلاَةُ، رواه أبو داؤد والنسائى-‘রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় আযান দু’বার ও এক্বামত একবার করে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল, ‘ক্বাদ ক্বা-মাতিছ ছালা-হ’ দু’বার ব্যতীত। আবুদাঊদ,মিশকাত হা/৬৪৩। বালা-মুছীবতের সময় বিশেষভাবে আযান দেওয়ারও কোন দলীল নেই। কেননা আযান কেবল ফরয স্বলাতের জন্যই হয়ে থাকে, অন্য কিছুর জন্য নয়। আযানের উদ্দেশ্য হবে স্রেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এজন্য কোন মজুরী চাওয়া যাবে না। তবে বিনা চাওয়ায় ‘সম্মানী’ গ্রহণ করা যাবে। কেননা নিয়মিত ইমাম ও মুওয়াযযিনের সম্মানজনক জীবিকার দায়িত্ব গ্রহণ করা সমাজ ও সরকারের উপরে অপরিহার্য কর্তব্য। আহমাদ, আবুদাঊদ, নাসাঈ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ; নায়লুল আওত্বার ২/১৩১-৩২; আবুদাঊদ, হা/২৯৪৩-৪৫)। আযান ও জামা‘আত শেষে কেউ মসজিদে এলে কেবল এক্বামত দিয়েই জামা‘আত ও স্বলাত আদায় করবে।ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৯১ ‘আযান’ অধ্যায়, মাসআলা-১৮)। আবদুল্লাহ্ ইবনু ইউসুফ (র)......আবদুল্লাহ্ ইবনু আবদুর রহমান আনসারী মাযিনী .রাজিয়াল্লাহু আনহু থকে বর্ণিত, যে আবূ সায়ীদ খুদরী .রাজিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বললেন, আমি দেখছি তুমি বকরী চরানো এবং বন-জঙ্গলকে ভালবাস। তাই তুমি যখন বকরী নিয়ে থাক, বা বন-জঙ্গলে থাক এবং স্বলাতের জন্য আযান দাও, তখন উচ্ছকণ্ঠে আযান দাও। কেননা, জিন্, ইনসান বা যে কোন বস্তুই যতদূর পর্যন্ত মুয়াযযিনের আওয়ায শুনবে, সে কিয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। আবূ সায়ীদ বলেন, একথা আমি রাসূলুল্লাহ্ এর কাছে শুনেছি।( বুখারীঃ তা.পা ৩২৯৬, ৭৫৮৪৮) ইকামত হচ্ছে স্বলাত আরম্ভের ঘোষণা দেয়া। ইকামতকে দ্বিতীয় আযান বা দ্বিতীয় আহ্বানও বলা হয়। শারহুল উমদাহ: (২/৯৫)। ইক্বামতের জবাব আজানের মতই দিবে। কেননা আযান ও ইক্বামত দু’টিকেই হাদীছে ‘আযান’ বলা হয়েছে। [ মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৬৬২;
আল্লাহ বলেন, ﴿إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَوٰةِ مِن يَوۡمِ ٱلۡجُمُعَةِ فَٱسۡعَوۡاْ إِلَىٰ ذِكۡرِ ٱللَّهِ﴾“যখন জুমুআর দিনে স্বলাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও”। [সূরা জুমা(৯)] রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (বলেন:স্বলাতের সময় হয়, তখন তোমাদের একজন যেন আযান দেয় এবং তোমাদের মধ্যে বয়স্ক ব্যক্তি যেন তোমাদের ইমামতি করে”। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَنۡ أَحۡسَنُ قَوۡل ا مِّمَّن دَعَآ إِلَى ٱللَّهِ وَعَمِلَ صَٰلِح ا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ ٱلۡمُسۡلِمِينَ ٣٣﴾“আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত”। সূরা ফুসসিলাত: (৩৩)।(৩৮৯)। মানুষ যদি আযানের ফযিলত জানত, তাহলে তারা এর জন্য লটারি করত। নবী মুয়াজ্জিনের জন্য মাগফেরাতের দোয়া করেছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী বলেছেন:জিম্মাদার কারণ সে তাদের স্বলাতের হিফাজতকারী, তার উপর তার মুসল্লিদের স্বলাত নির্ভরশীল। আর মুয়াজ্জিন হচ্ছে আমানতদার। কারণ সে মানুষের স্বলাত ও সিয়ামের যিম্মাদার। হে আল্লাহ তুমি ইমামদের সঠিক পথ দেখাও এবং মুয়াজ্জিনদের ক্ষমা কর”। আবু দাউদ: (১/১৪৩),আল্লাহ তা‘আলা বলেন:﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَوٰةِ مِن يَوۡمِ ٱلۡجُمُعَةِ فَٱسۡعَوۡاْ إِلَىٰ ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَذَرُواْ ٱلۡبَيۡعَۚ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ٩ ﴾ [الجمعة: ٩] হে ঈমানদারগণ! জুমু‘আর দিনে যখন স্বলাতের জন্য ডাকা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং কেনা-বেচা ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে। - (সূরা আল-জুম‘আ: ৯); হাদীস শরীফে এসেছে, শিশুর ভূমিষ্ট হওয়ার পর তার কানে সর্বপ্রথম তাওহীদের শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি করবে; যদিও সে তখন এর অর্থ বুঝতে পারবে না। উবায়দুল্লাহ বিন আবু রাফে’ তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘ফাতেমা .রাজিয়াল্লাহু আনহু যখন হযরত হাসান .রাজিয়াল্লাহু আনহু কে প্রসব করলেন ; তখন রাসূলুল্লাহ .-কে তার কানে নামাজের আযান দিতে আমি নিজে দেখেছি।’ আযানের সকল শব্দই তাওহীদ ও কল্যাণের দিকে উদাত্ত আহবান।মুসলমানদের জন্য ওয়াজেব হল, মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাআত সহকারে স্বলাত আদায় করা। যেহেতু মহানবী . বলেন, “যে ব্যক্তি আযান শোনা সত্ত্বেও মসজিদে জামাআতে এসে স্বলাত আদায় করে না, কোন ওজর না থাকলে সে ব্যক্তির স্বলাত কবুল হয় না।” ১৫৪ (আবূ দাঊদ ৫৫১,)১৫৭ )(মুসলিম) । আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর যখন তোমরা স্বলাতের দিকে ডাক, তখন তারা একে উপহাস ও খেল-তামাশারূপে গ্রহণ করে। তা এই কারণে যে, তারা এমন কওম, যারা বুঝে না”। [সুরা মায়েদা: (৫৮)]মুয়াবিয়া ইব্ন আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ .কে বলতে শুনেছি:“মুয়াজ্জিন গণ কিয়ামতের দিন সবচেয়ে উঁচু গর্দানের অধিকারী হবে” মুসলিম: (৩৮৭)।মুওয়ায্যিনের আযান ধ্বনির শেষ সীমা পর্যন্ত সজীব ও নির্জীব সকল বস্ত্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে ও সাক্ষ্য প্রদান করে। ঐ আযান শুনে যে ব্যক্তি স্বলাতে যোগ দিবে, সে ২৫ স্বলাতের সমপরিমাণ নেকী পাবে। মুওয়ায্যিনও উক্ত মুছল্লীর সমপরিমাণ নেকী পাবে এবং তার দুই আযানের মধ্যবর্তী সকল (ছগীরা) গুনাহ মাফ করা হবে’।নাসাঈ, আহমাদ, মিশকাত হা/৬৬৭ ) লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক , সাংবাদিক ও ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা।
