সূর্য সন্তান:বাংলার আলো ব্যকরণবিদ হরলাল রায়



“পাহাড়পুর পান্তি,রাজামেহার,ধামতী,
কুড়াখাল, কুরুন্ডি, 
বাপে-বেটায় অরুন্ডি।”

কবিতার এ ক”টি চরণের মাধ্যমে সেই যে হরলাল রায় আমাদের মনে স্থায়ীভবে দাগ কেটেছেন, তা আমরা আজো ভুলিনি। ১৯৩৫ সালে এই খ্যতিমান ব্যক্তিটির জন্ম। তিনি পিতা হৃদয় চন্দ্র রায় এবঙ মাতা মাতঙ্গিনী দেবীর অত্যন্ত আদরের সন্তান ছিলেন। বাল্যকাল গ্রামেই কেটেছে তার। তবে গ্রামের অন্যান্য ৮-১০ জন বালকের চেয়ে একটু আলাদা ছিলেন বালক হরলাল। স্কুলে ভর্তি হতে দেরী করেন নি। ঠিক পাঁচ বৎসর বয়সেই স্কুলের আঙ্গিনা মারিয়েছেন তিনি। ১৯৪০ সালে ধামতী প্রাথমিক বিদ্যায় দিয়ে তার লেখাপড়ার অগ্রযাত্রা হয়।

১৯৪৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন দেবিদ্বারের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান গঙ্গামন্ডল রাজ ইনস্টিটিউটে। এখান থেকে চলে যান কুমিল্লা শহরের ঈশ্বর পাঠশালায়। ইষ্ট বেঙ্গল সেকেন্ডারী এডুকেশন বোর্ড ঢাকা থেকে তিনি ১৯৫০ সালে ১ম বিভাগে মেট্রিকুলেন পাশ করেন,তারপর আসেন তৎকালীণ মহকুমা শহর বিবাড়ীয়ায়। এখানকার বিখ্যাত কলেজটির বাংলা বিষয়ের দায়িত্ব নেন তিনি।১৯৭৯ সালে প্রভাষক পদ থেকে প্রমোশন পেয়ে হয়ে যান সহকারী অধ্যাপক। ১৯৮৪ সালে পেশাগত দিক দিয়ে আরেকটু অগ্রসর হন হরলাল, সহযোগী অধ্যাপক হয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় চলে যান। 

১৯৮৬ সালে ১৪ মার্চ আবারো বিবাড়ীয়ায় ফিরে আসেন উপাধ্যক্ষ হয়ে।কিছুকাল কাজ করেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে।অধ্যাপনা করাকালীন সময়ে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্হণ করে নিজেকে দক্ষ করে তোলেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলায় বি.ই.আর.আই.১৯৮৬ সালে নিয়েরার পরিচালিত কলেজ প্রশাসনে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান তিনি ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করেন। শ্রী হরলাল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বিভিন্ন বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবে বহুবছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডঃ মনিরুজ্জামান এর তত্ত্বাবধানে দিনেশ চন্দ্র সেনের উপর থিসিস করেন। তিনি শিক্ষকদের কল্যাণে মনোনিবেশ করেছিলেন। শিক্ষকদের ঐক্যবধ্য রাখার জন্য তিনি ১৯৭১ সালে ত্রিপুড়াতে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (পূর্বাঞ্চলীয়) গঠন করেন। এ সমিতির মাধ্যমে তিনি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি ও প্রসার করার চেষ্টা করেন।

হরলাল রায় একজন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের লোক ছিলেন। তিনি তার মেধা, বুদ্ধি, ও মনন দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করার পক্ষে কাজ করেন। যুদ্ধের সময় ত্রিপুড়ায় অবস্থান করেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বাংলাদেশ ও ভারতের গণ্যমান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও কবি সাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ ছিল। যুদ্ধের পর দেশে ফিরে এসে দেখেন সকল বই পত্র ও ঘরবাড়ি পাকিস্থানী সন্যরা ধ্বংস করে ফেলেছে। তিনি আবার নতুন মনোবল নিয়ে নতুন দেশটি গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ব্যকরণের বিভিন্ন জটিল বিষয়কে তিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাবে উপস্থাপন করেছেন। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা ভীষণ উপকৃত হয়েছে। তার লিখিত বইগুলো শুধুমাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যই শিক্ষনীয় ছিলনা, সকল শ্রেণীর পাঠকরা এতে উপকৃত হয়েছে। এমনকি বাংলা বানান ও ব্যকরণের দূর্লভ বিষয়ের সমাধানে গবেষকগণও তার দ্বারস্থ হতেন। আজ হরলাল নেই, আছে তার অক্লান্ত পরিশ্রমে লিখিত ব্যকরণের বিশাল ভান্ডার। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যকরণ ও রচনা, ছোটদের ব্যকরণ ও রচনা, উন্নতর বাণিজ্যিক বাংলা, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, এসো বাংলা শিখি, রচনাদর্শ ও কিশো বাংলা ইত্যাদি।

 তিনি যখন যেখানে চাকুরী করেছেন সেখানকার কবি সাহিত্যকদের নিয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতি কেন্দ্রিক সংগঠন গড়ে তুলেছেন।এমনই একটি প্রতিষ্ঠান ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সাহিত্য একাডেমী।এটি এখনো সাহিত্য প্রেমিকদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান।শ্রী হরলাল রায় তিন সন্তানের জনক ছিলেন। বড় ছেলে ভাষণ রায় এমএসসি পাশ করে বিদেশে অবস্থান করছেন। ছোট ছোলে ডাঃ কলোল রায় রাশিয়া থেকে ডাক্তারী পাশ করে বর্তমানে বিবাড়ীয়ায় অবস্থান করছেন। এছাড়া একমাত্র কণ্যা ভারতী রায় বিএ পাশ করেছেন। ড. হরলাল রায় ১৯৮৮ সালের ৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া কলেজ থেকে শিক্ষাসফরে কক্সবাজারে গিয়ে বাড়ী ফেরার পথে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান। তার রচিত গ্রন্থগুলো তার অমরত্ব দান করেছে।

  লেখক: 
প্রভাষক মমিনুল ইসলাম মোল্লা
ক্যাম্পেনার সিডিএলজি এবং সহকারী সম্পাদক 
দৃষ্টান্ত ডট কম,কুমিল্লা


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.