দিবস পরিক্রমাঃ প্রতিদিন ভালবাসা চাই

দিবস পরিক্রমাঃ প্রতিদিন ভালবাসা চাই

মমিনুল ইসলাম মোল্লা
সকালের পছন্দের একটি দিন ১৪ ই ফেব্রæয়ারী। পৃথিবীতে যার চেয়ে বেশী উচ্চারিত হয় লাভ শব্দটি। যিনি যে ভাষায়ই কথা বলুন না কেন লাভ বা ভালবাসা শব্দটি জীবনে কখনও ব্যবহার করেননি ত্রমন কোন ব্যক্তি পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেই ভালবাসা দিবস ১৪ ফেব্রুয়ারী। সংকীর্ণ অর্থে ভালবাসা শব্দটি তরুন-তরুনীদের ব্যবহৃত হলেও, ব্যপক অর্থে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, মাতা-মেয়ে শাসিতের প্রতি শাসকের ভালবাসা, কাজের প্রতি কর্মীর ভালবাসা সবকিছুকেই বোঝায়। ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রাচীন রোমবাসী কুমারী মেয়েরা একটি দিনে ভালোবাসার কাব্য লিখে জমা করত মাটির পাত্রে, আর যুবকেরা পাত্র থেকে তুলে নিত একটি লেখা। ব্যপারটি ছিল পুরেপুরি ভাগ্য প্রসূত। যুবকের হাতে উঠে আসত যার লেখা সেই মেয়েটিকে ভালবাসত সে। তার সঙ্গেই হতো যুবকের বিয়ে। ভাগ্যের সূত্র ধরে মেয়েটি হত যুবকের জীবনসঙ্গী। যে দিন এ ঘটানটি হত  সেদিনটি ছিল ১৪ ফেব্রæয়ারী। ভ্যালেন্টাইনস ডে সম্পর্কে বহু ধরণের গল্প শোনা যায়। একটি কাহীনি এরকম- সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের দুই  রাবোর অস্তিত্ব ছিল এক সময়। রোমান স¤্রাট দু’শ খৃস্টানদের এদিনে এদের একজনের শিরচ্ছেদ করেছিলেন। কারন তিনি সৈনিক যুবকদের বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। আবার নিজেই বিয়ে করেছিলেন যুবতীকে। আরেকটি তথ্যে জানা যায়- ভ্যালেন্টাইন রোমানদের দেবী পূজার বিরোধী ছিলেন।  এ অপরাধে তাকে বন্ধী করা হলে রাজবোর বন্ধুরা তাদরে ভালবাসার কথা লিখে কারাগারে ছুড়ে দিত। বলা হয় ২৬৯ সালের ১৪ ফেব্রæয়ারী তাকে হত্যা করা হয়। এই থেকেই সূচনা ভালবাসা দিবসের।

বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা উল্টালেই চোখে পড়ে “কুমারী সাদী সন্তানের স্বীকৃতি চায়।” “ম্যানহোলে অসহায় শিশুর ক্রন্দন।” “ভন্ড প্রেমিকের কাছে প্রতারিত রাখি।” “প্রেম প্রত্যাখ্যানে এসিড নিক্ষেপ।” ফ্রি সেক্সের দেশ বাংলাদেশ নয়। তবুও আমাদের দেশে ভালবাসা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে না। নির্দিষ্ট নেয়মে ভালবাসলে সে ভালবাসা কারো ক্ষতি করতে পারে না। বাঙ্গালী গীতিকার লিখেছেন “আমি পাথরে ফুল ফোটাব ,শুধু ভালবাসা দিয়ে।” সত্যিই তাই। ভালবাসার শক্তি দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। বস্তুত ভালবাসার কারনেই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে। ভালবাসার ভিত্তিতেই টিকে আছে আদি পিতা আদম ও হাওয়ার ভালবাসার কারনেই মানব সন্তানের জন্ম। তাই আমরা একা বাস করতে পারি না। পিতা-মাতা, ভাই-বোন কিংবা বন্ধু-বান্ধবরা একে অপরকে ভালবেসে সুখের নীড় গড়ে তোলে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা স্বর্গীয় সুখ লাভ করতে পারছি না। আজো বাংলাদেশের শহর বন্দরে, গ্রাম-গঞ্জে, পিতা-পুত্রে, স্বামী-স্ত্রীতে এমনকি ভাইয়ে ভাইয়েও বিরোধ লেগে আছে। সামান্য স্বার্থের লোভে পিতা-পুত্রকে আঘাত করছে। পুত্র-পিতার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। প্রেম প্রত্যাখ্যাত যুবক এসিডে ঝলসে দিচ্ছে প্রেয়সীর মুখ। ভালবাসার অভাবেই এমনটি হচ্ছে।

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ সৃষ্টির পূর্বে পরিবার গড়ে উঠেছে। পরিবারের সাথে যৌন জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আদিম মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট যৌন জীবন ছিল না। তখন যে কোন পুরুষ যে কোন নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারত। কিন্তু সন্তান সন্তাতর জন্ম পরিচয় ও লালন-পালন নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়ায় পরিবার গড়ে উঠেছে।

সামাজিক অনাচারের কথা বলতে গিয়ে আমরা মানুষকে পশুর সাথে তুলনা করি। পশুদের সমাজে পাপবোধ বলে কিছু নেই। আইনের বা শাস্তিরও ভয় নেই। তবুও তাদের সমাজে যৌনজীবন নিয়ন্ত্রিত। একটি পায়রা আরেকটি মাদি পায়রার সাথে জোড়া বাধলে ঐ মাদী পায়রাটিকে অন্য কোন পায়রা বিরক্ত করে না। যারা মানুষ হয়েও মানুষের মত যৌন আচরণ করেনা তাদেরকে পশুর নিকট থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। প্রাপ্ত বয়স্ক নারী ও পুরুষ তাদের পছন্দের ভিত্তিতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার গড়তে পারে। ইসলাম ধর্মে বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর পছন্দকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদের সমাজে বিবাহ পূর্ব প্রেম প্রচলিত। নিষ্কলুষ প্রেমে দোষের কিছু নেই। তাবে পশ্চাত্য সমাজের মত ব্যাভিচারকে আমরা সমর্থন করি না। এ ব্যপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে - “তোমরা ব্যাভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অত্যন্ত লজ্জাকর ও কুপথ” (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-৩২)।  যারা তা করে তারা মহাপাপী হবে। (সূরা ফোরকান, আয়াত-৬৮) এমন লোকের তওবা কখনও কবুল হবার নয় যারা কুকর্ম করে। আমি তাদের জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি তৈরী রেখেছি। (সূরা নিসা, আয়াত-১৮)। দুঃখ জনক হলেও সত্য মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে বিবাহপূর্ব যৌন জীবন যাপনের সংবাদ পাওয়া যায়। পত্রিকার পাতা উল্টালেই এধরণের বহু সংবাদ আমাদের চোখে পড়ে। বিয়ের লোভ দেখিয়ে ভন্ড প্রেমিকেরা নারীদের সর্বনাশ করে। মনোবসনা পূর্ণ হওয়ার পর লম্পট ধীরে পিছু হটে। তখন অবলা নারী কারো নিকট প্রতারনার কথা বলতে পারে না আবার সইতেও পারে না। কারণ আমাদের সমাজ পুরুষ শাসিত। এই ধরণের ঘটনার সকল দোষ নারীর উপর চাপানো হয়। প্রতারক ছেলেটি হয়ত অন্য কোথাও বিয়ে করে সুখের সন্ধান করে। কিন্তু মেয়েটির বিয়ে দিতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এ ধরনের ঘটনা জেনে-শুনে কোন ভদ্র বিয়ে করতে রাজী হয় না। দ্বীপক্ষীয় ভালবাসায় কেউ প্রতারিত হয় না। ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালবাসা দিবস সত্যিকারের ভালবাসার প্রতীক বহন করে। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  প্রভাষক , সাংবাদিক ও ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা।



শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.