পীর বাদশাহ মিয়ার কথা


পীর বাদশাহ মিয়ার কথা  


অনেকের ধারনা বাংলাদেশের পীর-মাশায়েখগণ রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করে শুধুমাত্র ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত আছেন এবং অতীতেও এমনটি করেছেন। অধিকাংশ পীর-সাহেবদের ক্ষেত্রে কথাটি সঠিক হলেও দু একজন ছিলেন ব্যতিক্রম। এরা আল্লাহর হক আদায়ের পাশাপাশি বান্দার হক আদায় করার জন্য সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। পতিতা উচ্ছেদ আন্দোলনে অংশগ্রহন করেছেন কারাবরণ করলেও পিছপা হননি। এমনই একজন পীর ছিলেন পীর বাদশা মিয়া।
হাজী শরীয়তুল্লাহর বংশাধর পীর বাদশা মিয়া ১৮৮৪ সালের ২২শে মাদারীপুরের বাহাদুরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাদের বাসস্থানে প্রতিষ্ঠিত ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন। পরবর্তীতে ঢাকা মুহসনিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন। পরবর্তীতে ঢাকা মুহসনিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করেন। জামাতে উলায় পড়ার ক্ষমতা তার পিতা হযরত মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমদ মারা গেলে তিনি আর লেখাপড়া করেন নি। ১৯০৭ সালে তিনি ঢাকার নবাব কুটিরের সুপ্রসিদ্ধ মৌলভি থাকা রাছুল। বখশ এর ৩য় কন্যা মোসাম্মৎ ছালেহা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ বাহাদুর। বগুড়ার নবাব আলী বাহাদুর সহ অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ ঢাকার শাহবাগে অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। বাদশা মিয়া এ সম্মেলনে ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। 
১৯০৬ সালে নবাব স্যার সলিমুল্লার উদ্যোগে মুসলিম লীগ গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। দল প্রতিষ্ঠায় পর তিনি ১৯০৭ সালে ঢাকায় তার মুরিদদের নিয়ে বিরাট কনফারেন্স করেন। ১৯২১ সালে তিনি খেলাফত আন্দোলনের সাথে জড়িত হোন। ইংরেজ সরকার তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। তিনি বৎসর কারাভোগ করেন।
তাকে গ্রেপ্তার করে নেয়ার পর মাদারীপুর এসডিওর বাসায় বুঝানো হয়। এসডিও তাকে রাজনীতির সাথে জড়িত না থেকে আল্লাহর এবাদত বন্দেগীতে মুশগল থাকায় পরামর্শ দেন। বাদশা মিয়া মনে করতেন রাজনীতির সঙ্গে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বরং এটা ইসলামের একটি শক্তিশালী অঙ্গ। ঈমান-আকীদা, এবাদত রাজনীতি অর্থনীতি ও সমাজনীতি প্রভৃতির সমষ্টির নাম ইসলামী রাজনীতি। 
১৫ আগষ্ট ১৯২২ তিনি কারাগারে থেকে মুক্তিপান। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সোজা কলকাতা খেলাফত অফিসে চলে যান। সেখানে তৎকালীন ইসলামী আন্দোলনকারীদের সাথে সাক্ষাত হয়। 
১৯২৪ সালে তিনি ১২’শ হজ্জ যাত্রী নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হন। সৌদি আরবে পৌঁছলে বাদশাহর দূত তাকে আহলান সাহলান বলে স্বাগতম জানায়। ১৯২৪ সালের ১১ জুলাই হজ্জ সমাপন শেষে বাদশা পীর সাহেনকে তার গাড়িতে করে জেদ্দায় পৌছেছেন। 
১৯৩৬ সালে শেরে বাংলা মৌলভী আবুল কাশেম ফজলুল কত হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পাটি গঠিত হয়। তিনি এ পার্টির পৃষ্ঠপোষক পদে অধিষ্ঠিত হন। তৎকালীন সময়ে হিন্দু-মুসলিম দাঁঙ্গা শুরু হলে তিনি দাঁঙ্গা প্রশমনে ভূমিকা রাখেন। কলকাতা, ঢাকা ও নোয়াখালীতে এ দাঁঙ্গায় ২৫-৩০ হাজার লোক মারা যায়।
বাহাদুরপুর শরীতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা পীর বাদশাহ মিঞা একটি আর কীর্তি। ১৩৩৭ সালের ১লা ভাদ্র তার বাসভবনে ফরায়েজী আন্দোলনের নেতার নামানুসারে উচ্চ কওমী মাদ্রাসা হিসাবে এটি স্থাপিত হয়। ১৯৪৫ সালে মাদ্রাসাটির কাজ পুনরায় আরম্ভ করা হয় এবং বর্তমানে এ মাদ্রাসা হতে প্রতিবছর বহু আলেমদের হয়ে দেশ বিদেশের খেদমত করছেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হয় এবং মুসলিম লীগ সরকার গঠন করে। বাদশা মিঞা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পতিপালক উচ্ছেদের দাবী জানান। কিন্তু মুসলিম লীগ পতি পুনর্বাসন সমস্যার কথা বলে এ ব্যাপারে কালক্ষেপন করতে থাকে।
১৯৫০ সালে চাঁদপুর পুরানবাজারে ঈদে মিলাদুন্নবীর সম্মেলনে যোগদান কালে কয়েকজন মহিলা লিখিতভাবে পতিতালায় উচ্ছেদের অবরোধ জানান। তিনি জুম্মার নামাজের পর মুসল্লীদের পতিতালায় উচ্ছেদের নির্দেশ দিলে ৭৫০ জন পতিতা উচ্ছেদ হয়। পরবর্তীতে অনেকেই তওবা পড়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সঠিকভাবে জীবন যাপন করে। 
১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার সম্পাদক রসূল (সাঃ) সম্পর্কে কটাক্ষ করলে তিনি সে উক্তির প্রতিবাদ জানান। ১৯৫৮ সালে নেজামে ইসলাম পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনে সুন্নাহ বিরোধীদের বিরুদ্ধে বিষোধঘার করেন। তিনি ঘোষনা করেন “যদিও আমি গত বছর বয়সের বৃদ্ধ কিন্তু রসূল (সাঃ) এর সুন্নাহর সম্পাদক রক্ষার্থে আমি একজন তরুন নওজোয়ান। সুন্নাহর সমাধান বজায় রাখতে আমি আমার জানমাল উৎসব করতে প্রস্তুত। তিনি ১৯৫৯ খৃষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। 


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.