কুমিল্লার মুরাদনগরের আবদুল মতিন চৌধুরী
মমিনুল ইসলাম মোল্লা ঃযুদ্ধাহত এক বীর মুক্তিযোদ্ধা রাজনৈতিক কারণে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীর চাকুরী থেকে অবসরে আসা সহ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার অভিযোগ করেছেন কুমিল্লার মুরাদনগরে (অবঃ) সেনাদসদস্য কর্পোরেল আবদুল মতিন চৌধুরী। মহান মুক্তিযোদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার কারণে মাত্র ৯ বছর কর্মজীবন শেষ না করতেই সেনাবাহিনীর চাকুরী হতে অবসর দেওয়া হয় তাকে। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একজন প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন ছাড়াও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম স্বাক্ষী ছিলেন।
যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লিখাতে না পারা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যামামলার অন্যতম স্বাক্ষী কর্পোরেল অবসরপ্রাপ্ত আবদুল মতিন চৌধুরী জানান, কী কারণে এবং কার অবহেলায় যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আমার নাম নেই তার সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাখ্যা জানা নেই, তবে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন বলে তিনি অভিমত পোষণ করেন।
যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহযোগিতা চান তিনি। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯নং দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামের মৃত- আম্বর আলীর ৩য় ছেলে আবদুল মতিন চৌধুরী মহান স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষনে অনুপ্রাণীত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে শতঃস্ফুর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২০ বছর বয়সে আবদুল মতিন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য ভারতের অম্বিনগর, মতিনগর, মেলাঘর, আগরতলার, শালবন ও লাটিটিলায় দীর্ঘ্য ১ মাস ১৮ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর ১৯৭১ সনের ২৫শে এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়ার মেহেরপুর ১৭ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২ ফিল্ড আর্টিলারী (২য় গুলন্দাজ বাহিনী) তে ২৯৩৮৪০৪ নং সৈনিক হিসাবে যোগ দেন।
সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সৈনিক হিসাবে পারদর্শিতার সহিত তিনি গার্ণার, নায়েক, কর্পোরাল পদে উন্নিত হন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে ২নং সেক্টরের অধীনে ভারতের লাটিটিলা নামক স্থানে মেজর রাশেদ এবং লেঃ সাজ্জাদ জহির এর সাথে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মেরিন টি গার্ডেন সমসেরনগর, মঙ্গলাবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। এছাড়া কোকিতলা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে তার বাম পায়ের হাটুতে মারাতœক আঘান পান এবং আহন হন। তবুও তিনি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এগিয়ে যান। ফলে কোকিতলা যুদ্ধে জয়লাভ করেন।
বিরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কারণে তিনি বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন। তার মধ্যে মেডেল, সামরিক খেতাব, ইমতিয়াজ খেতাব, ভিক্টোরিয়া মেডেল, কন্সটিটিশান মেডেল, ক্যাপ্টেন স্টার, ওয়ার মেডেল, লিভ্রারেশন স্টার উল্লেখযোগ্য। যুদ্ধাহত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ডাক্তারি মতে ও.এ.আর (আই)’র ১৭২ নং নির্দেশ অনুযায়ী চরিত্র সম্পর্কিত মন্তব্য ভাল ঘোষনা নিয়ে ১৯৭৯ সালের ১ডিসেম্বর দীর্ঘ ৮ বৎসর ৬ মাস ৬দিন চাকুরী করার পর সেনাবাহিনীর চাকুরীতে হতে তাকে অবসর দেওয়া হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী এ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার ১৯ নং স্বাক্ষী। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক কর্পোরেল অবঃ প্রাপ্ত আবদুল মতিন চৌধুরী জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে পারেননি।
বর্তমানে তিনি মুরাদনগর উপজেলার কাজিয়াতল গ্রামে দুচালা একটি টিনের ঘরে স্ত্রী, দুই ছেলে চার মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাতে সরাসরী স্বাক্ষাত করে তার সাথে খোলামেলা আলাপ করতে চান কি না এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মনে উদার ও মহানুভবতা থাকলে তথা সত্যিকার অর্থ তাঁর বাবার সমর্থকদের খোঁজ খবর নিতে চাইলে তিনিই ভাল বুঝেন কী করতে হবে। তিনি আক্ষেপ করে আরও বলেন প্রধানমন্ত্রী মহানভবতা কিংবা কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলে তিনিই তো আমার বাড়ী আসতে পারেন। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক ও সাংবাদিক, কুমিল্লা।