ধাতব মুদ্রা এখনও প্রয়াজনীয়তা হারায়নি

ধাতব মুদ্রা এখনও প্রয়াজনীয়তা হারায়নি 

মমিনুল ইসলাম মোল্লা

বাংলাদেশে বর্তমানে কাগুঁজে নোট হিসেবে ১, ২, ৫, ২০, ৫০, ১০০, ৫০০ ও  ১০০০ টাকা মূল্যমানের  মুদ্রা চালু র য়েছে। এছাড়াও  ১, ২, ৫, ১০,২০, ৫০, ট১, ট২ ও  ট৫ মূল্যমানের  ধাতব মুদ্রা চলমান র য়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের  তথ্যানুযায়ী মুদ্রা বাজারে   বর্তমানে ১, ২, ও  ৫ টাকা মূল্যের  ধাতব মুদ্রার  মধ্যে ২৫ কোটি টাকার  ১ও  ২ টাকা এবং ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের  ৫ টাকা মূল্যমানের  মুদ্রা রয়েছে। ২০১৫ সালের  ১৮ জানুয়ারি  অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সচিবালয়ে ধাতব মুদ্রার  ব্যাপারে  একটি বক্তব্য প্রদান করেন। তখন ৫ টাকার  নোটকে সরকারি ভাবে ছাপানোর  উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এছাড়া তখন তিনি বলেিেছলেন ১ টাকা ও  দুই টাকার  নোট বাজার  থেকে তুলে নেয়া হবে। ব্যাংকগুলো জনসাধারণের  নিকট থেকে ধাতব মুদ্রা গ্রহণ কর ছেনা। এ মুদ্রা গ্রহণ না করায় বিশেষ করে  দেশের  দক্ষিণাঞ্চলে কয়েকটি জেলায় মানববন্ধনসহ জেলা প্রশাসকের  নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেছে। ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে স্কুল ব্যাংকিং চালুর রয়েছে। ধাতব মুদ্রা যদি স্বাভাবিকবাবে কেউ নিতে না চায় তাহলে এ ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হবে। পকেটে খুচরো পয়সা না রেখে ছেলে মেয়েদের  হাতে দিয়ে দিলে তারা তা মাটির  ব্যাংকে জমা করে  রাখতে পারে । এভাবে তাদের  সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে উঠে। ক্ষুদ্র সঞ্চয় ভবিষ্যতে মিতব্যয়ী ও  সঞ্চয়ী হতে সাহায্য করে । বর্তৃমানে দোকানীরা বিভিন্ন অজুহাতে কয়েন নিতে চায় না। কোন কাস্টমার  এক টাকা পাও না হলে তাকে একটি চকলেট দিচ্ছেন গ্রামের  অধিকাংশ পরিবারে  মাটির  ব্যাংক  রয়েছে। এগুলোতে মূলত পরিবারের  ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ধাতব মুদ্রা জমিয়ে রাখে। মাটির  ব্যাংকটি ভরার পর  তারা তা অপসারন করে  এমনটি নয়। বিশেষ কোন উপলক্ষ যেমন ঈদ, পুজা, মেলা, ওরস, মাহফিল ইত্যাদি উপলক্ষকে কেন্দ্র করে  তারা এগুলো জমায় এবং নির্দিষ্ট সময়ে মাটির  ব্যাংকে ভেঙ্গে মুদ্রাগুলো বাজারে  নিয়ে আসে। আমাদের  দেশে শীতকালে এসব প্রোগ্রাম বেশি হওয়ায় এসময় বাজারে  কাঁচা পয়সার  সরবর াহ বেশি দেখা যায়। একসময় ভারতেও  এক, দুই, ও  পাঁচ টাকা মূল্যমানের  নোট চালু ছিল,  ধাতব মুদ্রার  সমস্যা হওয়ায় এগুলো বাদ দেয়া হয়। পাকিস্তানে পাঁচ টাকা মূল্যমানের  ধাতব মুদ্রা প্রচলনের  পর  নোট ছাপানোর  বন্ধ করে  দেয়া হয়। জনসাধারণের  স্বাভাবিক ও  নায্য লেনদেনের  স্বার্থে বেিশ্বর  প্রতিটি দেশেই নিম্নমানের  মুদ্রা প্রচলনে দেয়া হয়ে থাকে। ছোট-ছাট লেন-দেন বা ক্রয়-বিক্রয়ে এ ধরণের  মুদ্রা অধিকতর  হাত বদল হয়। একই মানের  দুই টাকা ও  পাঁচ টাকা মূল্যমানের  নোট াামাদেন  দেশে চালু আছে। তবে কাগুঁজে নোট সহজেই ময়লাযুক্ত হয়ে ছিড়ে যায়। ফলে এটি আর  ক্রেতা -বিক্রেতাদের  চাহিদা মেটাতে পারে  না। একটি ময়লাযুক্ত বা ছেড়া –ফাটা নোটের  পরিবর্তে একটি নতুন নোট বাজারে  ইস্যু করতে হয়। এসব নোটের  আয়ুষ্কাল গড়ে ১ বছর  অথচ একটি ধাতব মুদ্রা অনেক বছর  পর্যন্ত টিকে থাকে। ধাতব মুদ্রা গ্রহণের  সঙকটকে  আরে া গভীর  করে  তুলছে কিছু মতলববাজ লোক। তার  বাজারে  গুজব ছড়াচ্ছে ধাতব মুদ্রা আর  চলবে না। ” এ ধরণের গুজবে কান দিয়ে অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন। তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই এ গুজব ছড়াচ্ছে । এতে মানুষ চিন্তিত হয়ে কম মুল্যে তাদের  ধাতব মুদ্রা এসব লোকের  হাতে তুলে দিচ্ছে।বাজারে  হঠাৎ করে  ধাতব মুদ্রার  সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় চা দোকান থেকে আরমাম্ভ করে  সকল শ্রেণির  ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। এ সমস্যাকে পুঁজি করে  অনেকে কমিশনে ধাতব মুদ্রার  ব্যবসা করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার  এক মহাজন জানান, ৫ টাকার  কয়েন আর  কাগজের  ৫ টাকা মূলত একই, কিন্তু ব্যাংক এগুলো নিতে চায় না। তাই আমরা  এগুলো চালাবো কোথায়? কেউ কেউ বলেন, ১ ও  ২ টাকার  মুদ্রা মান হারিয়েছে। বিশ্লেষকদের  মতে এ ধারণা ঠিক নয়। এখনও  বাচ্চাদের  চকলেট কিংবা চুইঙ্গাম কিনতে ১ টাকা অথবা ২ টাকার  মুদ্রার  প্রয়োজন হয়। পর্যকেক্ষণে দেখা গেছে  ১টাকার  কয়েন এখনও  ১ সেন্টের  চেয়ে বেশি শক্তিশালী। ২ টাকার  কয়েন ব্রটিশি ১ পেনির  চেয়ে বেশি মূল্যমানের । বাসে বা নৌকা ভাড়ায় এখনও  খুচরা পয়সা কাজে লাগে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ধাতব মুদ্রা নিতে অস্বীকার  করে। তাদের  দাবী তাদের  কাছ থেকে  যারা মাল কিনেন তারা এসব ধাতব মুদ্রা নিতে চায় না। এছাড়া অধিকাংশ দোকানদার  সাপ্তাহিক বা দৈনিক কিস্ততে মালের  মূল্য পরিশোধ করে । এসব কোম্পানীর  সেলসম্যানরা ধাতব মুদ্রা নিতে চান না। ফলে দোকানদারাও  অহেতুক ঝামেলায় যেতে চান না। 

তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ধাতব মুদ্রার  প্রচলনে আন্তরিক হতে হবে। সারা দেশে ধাতব মুদ্রার  সুষম বন্টনের  লক্ষ্যে তফসিলি ব্যাংকের  প্রতিটি শাখায় পর্যাপ্ত ধাতব মুদ্রা সংরক্ষণ ও  বিনিময়ের  জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের   সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তফসিলি ব্যাংকের  অনেক শাখায়ই ধাতব মুদ্রা নেই বা থাকলেও  নাম মাত্র। আবার  ধাতব মুদ্রার  প্রয়োজন হলেও  ব্যংকগুলো তা সংগ্রহ করে  না।  একটি কাগুঁজে নোট সাধারণত ৯ মাস , ক্ষেত্র বিশেষে সর্বোচ্চ দেড় বছর  পর্যন্ত ব্যবহার  করা যায়। অন্যদিকে ধাতব মদ্রার  সাধারণ আয়ুষ্কাল ৮ বছর  এবং ক্ষেত্র বিশেষে ১০০ বছর  পর্যন্ত ব্যবহার  করা যায়। একারণে কাগজের  নোটের  তুলনায় এর  খরচ ১০০ গুণ কম।  খুচরা টাকা না থাকার  অভিযোগে অনেক সময় ক্রেতাদেরকে কিছু টাকা ছেড়ে দিতে হয়। ফলে এ দুটি ধাতব মুদ্রার  ব্যবহার  কম হয়। বাংলাদেশ সরকার  ইচ্ছে কর লেই কয়েন তৈরি  করতে পারে  না। তাই আমাদেরকে কয়েন ব্যবহারে  সতর্ক থাকতে হবে। কয়েন তৈরি  করতে হলে প্রয়োজন পড়ে রাষ্ট্রের  বিভিন্ন অঙ্গের । প্রক্রিয়াগত কারণে সিদ্ধান্তের  পর  আন্তর্জাতিক দরপত্রের  মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে এগুলো তৈরি  কর া হয়। ২ টাকার  কয়েন তৈরি  করে  আনা হয়েছে জাপান থেকে। ৫ টাকাসহ অন্যান্য কয়েন মিলে প্রতি বছর  ৪ থেকে ৫শ  কোটি টাকা মূল্যের  কয়েন তৈরি  কর া হয়। 
বাংলাদেশ ব্যাংক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির  মাধ্যমে জনসাধারণকে এব্যাপারে  সঠিক তথ্য জানাতে পারে । সব ধরণের  ধাতব মুদ্রা লেনদেনের  বৈধ মাধ্যম  এ বিষয়টি াথমন্ত্রণালয় থেকেও  জনগণকে আশ্বস্ত করা অত্যন্ত জরুরি । বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে- অদুর  ভবিষ্যতে ১ ও  ২ টাকার  মুদ্রা বিলুপ্তির  পরিকল্পনা সরকারের  নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের  সার্কুলারে  ব্যাংকের  প্রত্যেকটি শাখায় কমপক্ষে ১,২ ও  ৫ টাকার  ১০ হাজার  পিস করে  ধাতব মুদ্রা এবং স্থানীয় কার্যালয়ে ও  অন্যান্য বড় শাখায় ৩০ হাজার  পিস করে  ধাতব মুদ্রা রাখার  নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এনিয়ম অমান্য করলে কোম্পানী আইনের  ১১২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা করা হবে। সচেতনতার  অভাব , কাগজ ছিদ্র করে  টাকার  বান্ডেল করা ও  অযতেœর  কারণে প্রতি বছর  গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার  কোটি টাকার  কাগুঁজে নোট পরিত্যক্ত হয় ও  হাত বদলের  মাধ্যমে এ নোটগুলো নষ্ট হয়ে ফিরে  আসে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ফলে আবার  নতুন টাকা ছাপাতে হয়। কিন্তু ধাতব মুদ্রাগুলো এতা সহজে পরিত্যক্ত হয় না। দাতব মুদ্রা নিয়ে উ™ভুত সমস্যার  সমাধান করতে হবে। এব্যাপারে  জনসাধারণকে আশ্বস্ত করতে হবে বিশ টাকার একটি নোট এবং ৫ টাকার  ৪টি কয়েন একই মুদ্রা। এটি করতে না পারলে বাংলাদেশের  বৈদৈশিক মুদ্রার  অপব্যবহারের  সঙ্গে বিষয়টি হবে বালাদেশ ব্যাংকের  জন্য অত্যন্ত সঙ্কটময়। এটি বাংলাদেশের  অর্থনীতির  জন্য হবে এক চরম পর ীক্ষা, তাই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। 
লেখকঃ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  প্রভাষক , সাংবাদিক ও ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা। 

শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.