বেসরকারী ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে
মমিনুল ইসলাম মোল্লা,বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের প্রয়াস চলছে। বিনিয়োগের ক্ষ্রেত্রে ১৭টি কর অবকাশ সুবিধা রয়েছে । বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বোর্ড যে একিেন্দ্রক সেবা ( ওয়ান স্টপ সার্ভিস) চালু করেছে তাকে আরো স¤প্রসারিত করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ বোর্ডকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশিদারী পিপিপি ও প্রস্তাবিত অর্থনেতিক অঞ্চল কর্তপক্ষ পৃথকবাবে না করে একই বোর্ডের আওতায় রাখা যেতে পারে।বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ৯ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএফএফ) হিসাবে তা ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।যা মোট ঋণের ২৬ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংকিংবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নামেই বেঁচে আছে। দেউলিয়ার পথে রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিু। অন্যদিকে শেয়ারবাজারের অবস্থা আরও খারাপ।
বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পাশপাশি ইউরেপিীয় ইউনিয়ন , কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সহ প্রাায় সব উন্নত দেশে বাংলাদেিেশ পন্য এখন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পা”েছ। তার মানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেএসব দেশে রফতাানি করলে বাজার সুবিধা পাওয়া যাবে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ সুবিধা নেই। বাংলাদেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য সরকার ৩২ টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি করছে। আরও ৮টি দেশের সাথে স¤প্রীতিমূলক চুক্তি করার চেষ্টা চলছে। একইভাবে আরও ২৮টি দেশের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আরো ২১ টি দেশের সঙ্গে বিশেষ ধরণের চুক্তি হবে। এ চুক্তিত অনুযায়ী বিদেশি বিনিয়োগকারীকে যে কোন দেশে আয়কর দিলেই চলবে।
দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য শিল্পায়নে বিনিয়োগ অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর বিনিয়োগে পুঁজি সংগ্রহের দুটি খাত হল ব্যাংক ও শেয়ারবাজার। কিন্তু গত কয়েক বছর পর্যন্ত ব্যাংকের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।প্রতি বছর দেশে যে হারে বিনিয়োগ নিবন্ধিত হয়, বাস্তবায়ন হার তার ধারে কাছেও নেই। আবার যেটুকু বাস্তবায়ন হয়, তার পুরোটাই বিদেশি পুনর্বিনিয়োগ। কাগজে-কলমে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়লেও তার সুফল পাচ্ছে না দেশ।এছাড়া নতুন বিনিয়োগ বা¯ বায়নের হার একেবারেই সামান্য। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্র বলছে, বড় দেশগুলোর পক্ষ থেকে যে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসে, নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত তা বা¯ বায়ন হয় না।অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ মাহবুব আলী জানান, বিদেশি উদ্যোক্তাদের শুধু মুনাফা ফেরৎ নেয়ার সুযোগ দিলেই তারা বিনিয়োগ উৎসাহী হবে না। বরং বিনিয়োগের জন্য গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ ও নি®কণ্টক ভূমির ব্যব¯’া করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রাজনৈতিক ¯ি’তিশীলতার উপর। দেশে এখন হরতাল বা অবরোধ না থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়ে গেছে। দেশীয় উদ্যোক্তারা যে ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিলেন তা তারা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়নে আগামী বছর কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, রফতানি ও সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সর্বোপরি বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এছাড়াও টাকা পাচার বন্ধে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়া জরু রি বলে মনে করছেন তারা। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হল বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। এক কথায় বললে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়নি।
অঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়েছিল। একই সময় ভারতে বেড়েছিল ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ সং¯’ার বিশ্ব বিনিয়োগ রিপোর্ট ২০১৪ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায় ২০১৩ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে, একটি দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য মৌলিকভাবে ৭টি পূর্বশর্ত থাকে। এগুলো হল- পুঁজির সহজ লভ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, পর্যাপ্ত জমি, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহসহ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্থিতিশীল কর কাঠামো, দক্ষ শ্রমিক এবং আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে সহজ ব্যবস্থাপনা।
এদিকে টানা কয়েক বছর থেকে চলে আসা বিনিয়োগে খরা কাটাতে বছরের শুরু তে অনেক হাঁকডাক ছিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও ব্যাপক প্রতিশ্রুতি ছিল। উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন প্রণোদনার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সুখবর নেই। বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতাগুলো আগের জায়গায়ই রয়েছে। ফলে বাড়েনি বিনিয়োগ।
এবছর বাড়বে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি। এক্ষেত্রে চলতি মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ।
কিন্তু গত বছরের আগস্টে এ হার ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ, সেপ্টেম্বর আরও কমে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, অক্টোবরে ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং সর্বশেষ নভেম্বরে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে নেমে এসেছে।অন্যদিকে আগের বছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ২ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর এ তিন সূচকের সম্মিলিত বার্তা হল দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে না।
ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ করা এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো চ্যালেঞ্জ তো থাকছেই। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান এবং কর আদায় বৃদ্ধি সম্ভব নয়।গত এক বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন কমেছে ৮২ হাজার কোটি টাকা। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম তলানিতে। সরকারি-বেসরকারি হিসাবেই কমছে বিনিয়োগ। কমে আসছে রফতানি আয়।
বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। মূলধন সংগ্রহের দুটি খাতই দুর্বল। এ খাতগুলোকে শক্তিশালী করে ব্যবসায়ীদের সহজে পুঁজির জোগান দিতে হবে। না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না। সামগ্রিকভাবে যা কর্মসংস্থান এবং পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।একটি দেশে বিনিয়োগ বাড়লে তিনটি নির্দেশক দিয়ে বোঝা যায়। প্রথমত, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়বে।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নতুন নতুন উদ্যোগ নি”েছ। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান করছে। বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠন করা হ”েছ বিএসএস। গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান করা হবে। ইন্ডাস্ট্রিতে বিদ্যুৎ দিতে অবক্ঠামো নির্মান করা হ”েছ। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো কার্যকর করতে হবেঃ ১. বিনিয়োগ বোর্ড মাসিক সভায় মিলিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী সে সভায় সভাপতিত্ব করবেন। বিনিয়োগ বোর্ডের সিদ্বান্ত সরকারের উ”চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এ এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রতিটি মন্ত্রণালয় , বিভাগ ও সরকারি সং¯’ার উপর বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৩. কর অবকাশ, আবগারি শূল্ক ,মূল্য সংযোজন কর, উপযোগ সেবা, ইত্যাদি বিষয়ে বিনিয়োগ, বোর্ডের সিদ্ধান্তসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত করতে হবে। বিদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিশনে মিনিস্টার পর্যায়ের একজন বিনিয়োগ কর্মকর্তা থাকবেন, তিনি বিনিয়োগবোর্ডের তত্তাবধানে বা সাথে কাজ করবেন। ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা,গণতান্ত্রিক ¯’ানীয় সরকারের ক্যাম্পেনার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক ও সাংবাদিক, ধর্মীয় গবেষক,সহকারী সম্পাদক,দৃষ্টান্ত ডট কম কুমিল্লা।
০৫/০১/২০