খেলাপী ঋণ অর্থনীতির বিষফোড়া
মমিনুল ইসলাম মোল্লাবাংলাদেশে ব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী ১৩টি ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের অধিকাংশই রয়েছে ২০ শীর্ষ ঋণ খেলাপির কাছে। ব্যাংকগুলো হচ্ছে ঃ ব্যাংক আল ফালাহ লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যংক অব পাকিস্তান, ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক লিমিেিটড, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, উরি ব্যাংক লিমিেিটড , ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিেিটড, যমুনা ব্যাংক লিমিেিটড, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিেিটড, বিসিবিএল ও এক্্িরম ব্যাংক লিমিটেড। এ প্রতিবেদন দেখা যায় মার্চের তুলনায় জুনে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ তালিকায় শীর্ষ ৩টি ব্যাংক হচ্ছে রুপালি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক এছাড়া সরকারি ৫টি ব্যাংক মোট খেলাপি ঋণের ৬৩ ভাগ ধারণ করেছে। কোন উদ্যোক্তা যদি পর পর দুই মাস ঋণের কিস্তি দিতে ব্যার্থ হন তখন সে ঋণকে ব্যাংকের ভাষায় স্পেশাল ম্যানশন একাউন্ট বা এসএমএ বলা হয়। তিন কিস্তি দিতে ব্যার্থ হলে তাকে নি¤œমানের এবং ৬ মাস কিস্তি না দিলে তা সন্দেহজনক ঋণ হিসেবে শেণিকরণ করা হয়। তারপর তা ধীরে ধীরে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। ২০১১-১২ সালের শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার কোটি টাকা । ২০১২ সালে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণে আগের বছরে তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৩ সালে তা আরো বৃদ্ধি পায়। ২০১২ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে যায় ১৯ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। ২০১২ সালের ডিসেম্বওে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬শ৯৭ কোটি টাকা। ৩ মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৩ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। যা ২১০ শতাংশ বেশি। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে খেলাপি ঋণের পরিমান মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১.৯১ শতাংশ।
অধিকাংশ ঋণ গ্রহিতা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। শেয়ার বাজারে ধ্বস নামার কারণে তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না । এছাড়া অেেক আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন। সেখান থেকেই ভালো রিটার্ন পাচ্ছেন না। তাই সমস্যায় পড়ে গেছেন। অনেক উদ্যোক্তা রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ঋণের সুদ মওকুফ করার জন্য আবেদন করেছেন। আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণকে বøক একাউন্টে রেখে দেয়ার আবেদন করেছেন। যারা গার্মেন্টস ব্যবসায়ের সাথে জড়িত তারা পোশাক রপ্তানি করতে না পেরে ঋণ খেলাপিতে পরিনত হয়েছেন। কারণ পোশাক দেশের বাইরে পাঠাতে না পারায় স্টক লটের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাদেও গ্যাস, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। কোন কোন ব্যবসায়ী টিকে থাকার জন্য বিকল্প জ্বালানী হিসেবে ফার্নেস ওয়েল ও ডিজেল ব্যবহার করছেন। কেউবা জেনারেটর ব্যবহার করছেন। গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ৩০ শতাংশ উৎপাদন করা সম্বব হয়নি বলে ব্যবসায়ীরা জানান। ফলে তারা অনিচ্ছা সত্বেও খেলাপিতে পরিনত হচ্ছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার কারণে ঋণ খেলাপির পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো, অদক্ষতার কারণেও বাড়ছে। কোন কোন ব্যবসায়ী অনিচ্ছা সত্বেও ঋণ খেলাপি হলেও কেউ কেউ ইচ্ছে করে ঋণ খেলাপি হচ্ছেন। এসব লোকদের সহযোগীতা করেন ব্যাংকের কিচু অসৎ কর্মকর্ত। যেমন হলমার্ক কেলেংকারি। এছাড়া ঋণ কেলাপিরা অর্থঋণ আদালতের আশ্রয় নেন এবং আইনজীবি নিয়োগ দিয়ে পার পেয়ে যান। ফলে ঋণ খেলাপির প্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া তারা ভূয়া ঋণ সৃষ্টি করে ঋণ সমন্বয় করার পাশাপাশি উচ্চ আদালতের শরনাপন্ন হচ্ছে। তারা আদালতে রিট করে ঋণ খেলাপিরা তালিকা থেকে নিজেদের নাম স্থগিত করিয়ে নিচ্ছে। এ সুবাদে তারা ঋণ খেলাপি হওয়া সত্তেও বাংলাদেশ ব্যংকের ঋণ নিয়মাচারকে পাশ কাটিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ব্যাকিং খাতে বিতরণ করা প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। এগুলো ৫ বছরের বেশি পুরনো খেলাপি ঋণ । এক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংক , জনতা ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফইইসি ব্যাংক, ও রুপালি ব্যাংক অন্যতম। এসময় ৩হাজার ৭১১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং রুপালি ব্যাংক অবলোপন করেছে ১ হাজার ১৯ কোটি ১৯ লাখ টাকার ঋণ।অর্থমন্ত্রী জানান,দেশে বর্তমানে ঋণ খেলাপি রয়েচে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭২৩ জন। ২০১৩-১৪ অর্থ বছওে বিভিন্ন উন্ন্য়ন সহযোগীর কান্ট্রি প্রোগ্রাম অনুযায়ী প্রায় ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই আগস্ট মাসে ৬৩ দশমিক ১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।” অর্থনীতিবিদদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরৎ দেয়ার জন্য চাপের মধ্যে থাকেন। কিন্তু বড় বড় উদ্যোক্তা ব্যাংকগুলোকে চাপে রাখেন। চলতি বছরের জুনের শেষে ৫৩টি ব্যংকের মধ্যে ৪৭ টি ব্যাংকের ৫২ হাজার ৩০৯ কোটি ৩২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ সৃষ্টি হয়েছে। ঋণ খেলাপি কমাতে বাংলাদেশ সরকার “ ব্যাংক কোম্পানী আইন ১৯৯৩ ” কে সংশোধন করে। এ আইনের ২৭ ধারা মোতাকে কোন ঋণ খেলাপিকে নতুন করে ঋণ দেয়া যাবে না। নিয়ম অনুযায়ী ৫০ হাজার টাকার উপরে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেছে এমন গ্রাহকের ঋণ তথ্য সগ্রহ করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংক । এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি প্রতিমাসে ১ কোটি টাকা বা এর উপওে ঋণ গ্রহীতাদের তথ্য সগ্রহ করার কথা। বর্তমানে নিয়ম কানুন সঠিকভাবে না মানার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমান বাড়ছে। ব্যাংকিং খাত থেকে খেলাপি ঋণ দূরিভূত করার লক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৩ সালে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে। সে সময় বাংলাশে ব্যাংক নতুন করে খেলাপি সৃষ্টি রোধ করতে এবং খেলাপি ঋণ আদায় করতে দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করে। এগুলো হচ্ছে আইনগত ও অন্যটি হচ্ছে পদ্ধতিগত পদক্ষেপ। ঋণ খেলাপি কমাতে সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং জোরদার আইনের যথাযথ ব্যবহার করা দরকার। ঋণ দেয়ার উদ্যেশ্যে মাঠে গিয়ে তত্তাবধান করতে হবে। যথাযথ ব্যবসাযীকে ঋণ দিতে হবে, না হলে ঋণ খেলাপি কমবে না। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মত রাষ্টায়ত্ব ব্যাংকগুলোকে শাসনের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে দেয়া উচিত বলে বিশেষ্ঞমহল মনে করেন। খেলাপিরা অনেক সময় সাময়িকভাবে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে মুক্তি পাচ্ছে। বর্তমানে এখাতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার। আর এ মামলাগুলোর পেছনে ব্যাংকের দাবির পরিমান প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ শ্রেণিকরণের নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরুর পর থেকে দেশের খেলাপি ঋণ বাড়তে শুরু করে। সেপ্টেম্বর থেকে এ নীতিমালা কার্যকর করার পর থেকেই খেলাপিদের পরিমান দ্বিগূণের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের ( বিঅইডিএস ) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত মনে করেন খেলাপি ঋণ বাড়ার দুটো কারণ রয়েছে। যার একটি হলো হল মার্কের মত কয়েকটি ঋণ কেলেংকারী এবং অন্যটি রাজনৈতিক অস্থিরতাজনিত অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির রাশ টেনে ধরতে না পারলে দেশের অর্থনীতিতে তা বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এবিষিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ডঃ সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন- গুটিকয়েক মানুষের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং খাত। এ থেকে ব্যাংকিং খাতকে বেড়িয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে খেলাপিদের সম্পদ জব্দ করে হলেও এসংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। তা না হলে ব্যাংকিং খাতের শৃংখলা রক্ষা করা যাবে না।
লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক ও সাংবাদিক, কুমিল্লা।