পণ্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করুন

পণ্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করুন

মমিনুল ইসলাম মোল্লা,

মাহে রমজান  আসার আগে প্রতি বছরই দ্রব্য সামগ্রীর পালে হাওয়া লাগে। ধীরে ধীরে তা আরো বৃদ্ধি পায়। বাজারের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকলে এ সমস্যা হতো না। ইফতারী সামগ্রী তৈরি সহ বিভিন্ন প্রকার তরকারি রান্নায় সয়াবিন তেলের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু প্রতি বছরই দেখা যায় রমজানে এবং রমজানের বাইরেও হঠাৎ করেই এ দ্রব্যটির দাম বেড়ে যায়। টিসিবির তথ্য অনুযাযী দেশে প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৬ লাখ টন ভোজ্য তেলের প্রয়োজন হয়। তুলনামূলকভাবে কম দাম থাকায় ব্যবসায়ীরা পাম ওয়েল বেশি আমদানি করে। পরিশোধিত পামওয়েল বিক্র করা হয় সোয়াবিন হিসেবে। দেশে প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ লাখ টন সোয়াবিন এবং ৮ থেকে ৯ লাখ টন পামওেয়ল আমদানি হয়। ভোজ্য তেলের পাশাপাশি শিশুদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত গুড়ো দুধের দামও রোজায় বৃদ্ধি পায়। এ দুটি পণ্য নিয়ন্ত্রণ করছে ১০ জন ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট। পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে তারাই এ দুটি পণ্যের রমরমা ব্যবসা করছে। এ ব্যবসায়ীরা সাারণত নেদারল্যান্ড, চেকো¯øাভাকিয়া,  জার্মানি ওনিওজিল্যান্ড থেকে আমদানি করে। গুড়ো দুধের ক্ষেত্রে এ সিন্ডিকেট ১০০ ভাগ লাভ তুলে নিচেছ।সরকার এ সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রনের  চেষ্টা করছে। দ্রব্য সামগ্রী নিয়নত্রণের জন্য সরকার রমজানের পূর্বে ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে , আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণকারীদের নিয়েও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে সবাই দ্রব্য সামগ্রীর দাম স্থিতিশীল রাখার কথা বল্লেও শেষ পর্যন্ত কোন চেষ্টাই সফল হয় না।  বাজারের এক ক্রেতা ফরিদ মিঞা বলেন, কয়েকদিনের ব্যবধানে কোন কোন দ্রব্যের দাম বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে। রমজান উপলক্ষে প্রতিবছর একটি সিন্ডিকেট পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারও তাই করছে। ইফতার ও সেহরীতে মাসজুড়েই কাঁচা তরকারি, ও মাছ মাংসের প্রয়োজন বেশি হয়। পাইকারি বাজারের বিক্রেতাদের  সাথে সাথে খুচরা বিক্রেতারা তাল মিলিয়ে সঙ্কটকে আরো জটিল করে। এ অবস্থায় স্বল্প আয়ের ক্রেতারা বিপাকে পড়ছেন। আটা বা গমের বাজারে কিছুটা সঙ্কট দেখা দিলে একদিন কুমিল্লার আবুল কাশেম গেলেন নাস্তা করতে। দোকানের পিচ্ছিটাকে টাকার কথা জিজ্ঞেস করতেই সে বল্ল পারোটার দাম আট টাকা। আগে যে পারোটা ৫ টাকা ছিল তা একলাফেই হয়ে গেল ৮ টাকা? তারপর তিনি হোটেল পরিবর্তন করতে থাকেন। কিন্তু একটা বিষয় অবাক হয়ে লক্ষ করেন আশেপাশের সব হোটেলেই পারোটা আট টাকা করে। জানা গেলে হোটেল এসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা কেউ ৮ টাকার কমে পারোটা বিক্রি করবেন না। এভাবে প্রতিটি পণ্য এখন সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কবলে চলে গেছে। 

সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কবল থেকে মুক্ত করতে সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ নেয়। একবার ঔষধ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম বেড়ে গেলে সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়। এজন্য ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়। অভিযুক্ত ব্যবসয়ীদের দন্ড দেয়া হয়। এতে ক্যামিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট এসোসিশেন ধর্মঘটসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে।  এক পর্যায়ে সরকারকে তাদেও নিকট নতি স্বকিার করতে হয়।  শুধু ইফতার সাগ্রীই নয় নিত্য পন্যের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব পন্যের মধ্যে রয়েছে রসুন, মাছ, মাংস, ও শাক সব্জির দাম। এছাড়া বেড়েছে কাঁচা মরিচ, আলু, বেগুন, শসা. আদা ইত্যাদি। যে সরকারই আসুক পরিস্থিতি এমন হয়েছে ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেকেটের ভেতর দিয়ে তাকে আাঁতাত করেই চলতে হবে। সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও পন্যের দাম ঠিক রাখতে বিডিয়ার শপ খুলতে হয়েছিল। তারপরও পণ্যের দাম ছিল নাগালের বাইরে। তাই সিন্ডিকেটকে সক্রিয় রেখে কোন পদ্বতিতেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এক সময় সপ্তাহে ১ বা ২দিন নির্দিষ্ট যায়গায় বা বটগাছের নিচে বসে ছোট ছোট দোকানদাররা চাল, ডাল, লবন, তেল বিক্রি করতেন। এখনও হয়তো কোন যায়গায় এধরণের পুরাতন স্মৃতি দেখা যায়; তবে সংখায় অনেক কম। এখন বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সুপারশপ চালু হচ্ছে।  এসব দোকানে একই সাথে ক্রেতারা পাচ্ছেন মাছ, মাংশ, ডিম, ডাল, কলা, পেপে । শুধু তাই নয় এখানে পাওয়া যাচ্ছে হারপিক্স, সাবান, জামা, জুতা, গহনাসহ অনেক কিছু। বর্তমানে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়েও সুপারশপগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে। একটি বড় সুপারশপ ৫০ টা দোকানের ক্রেতাকে নিয়ে যাচ্ছে। এতদিন যারা ছোট ছোট পুঁজি নিয়ে আলু, পেয়াজ, বিক্রি করতেন তারা এখন আর ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারছেন না। কেননা সুপারশপগুলো বড় পুঁজির অধিকারী। তারা ছোট দোকানদারদেও তুলনায় কম মূল্যে দ্রব্য সামগ্রী বিক্রি করতে পারেন। ফলে ক্রেতারা আর আগের মতো রহিম চাচার মুদি দোকানে যেতে চাচ্ছেন না। এভাবে ছোট ছোট দোকানদারদের অস্তিত্ব বিলিন হয়ে যাচ্ছে।  অন্যদিকে সুপারশপ নির্ভর একটি নব্য পুঁজিবাদী সিস্টেম চালু হচ্ছে। আর এতে মুনাফখোর ও কালোবাজারিদের অনেক সুবিধা হচ্ছে। বাংলাদেশে রমজান মাসে দ্রব্য সামগ্রীর দাম বৃদ্বির সাথে বহুজাতিক কোম্পানীগুলোও জড়িত। যেমন রমজানে বিশ্বের সকল মুসলিম দেশে খোর্মা খেজুরের ব্যাপক চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বিশ্বে যত পণ্য ও সেবা উৎপন্য হয় তার প্রায় এক চতুর্থাশ উৎপাদন করে বহুজাতিক কোম্পানী । অনেক কোম্পানীর বিক্রির পরিমান এত বেশি যে কোন কোন দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনও  এর  তুলনায় তুচ্ছ। ২০০৯ সালে ওয়ালমার্টের মোট বিক্রয়ের পরিমান ছিলও ৪১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই বছর বাংলাদেশের জাতীয় উৎপাদন ছিল মাত্র ৮৯.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজদের দায়ী করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বড় ব্যবসায়ী জাানান, মালমাল পরিবহনের সময় অন্যান্য সময়ের চেয়ে রমজানে চাঁদার পরিমান বেশি দিতে হয়। এসময় কমপক্ষে ১৫ যায়গায় চাঁদা দিতে হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাতেও কেউ কেউ দাম বাড়িয়ে নেন। তাদের এ দাবী অযৌক্তিক। কেননা রোজা শুরু হওয়ার অনেক আগেই এসব পণ্য তারা আমদানি করেছেন। 
একসময় পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলে সরকার নিজেই পেঁয়াজ আমদানি করে এবং দ্রæত সিদ্ধান্ত নিয়ে টিসিবির মাধ্যমে খোলা ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করতেই একদিনে ৮০ থেকে ৫০ টাকায় তা নেমে আসে। হঠাৎ ব্যবসায়ীরা কি করে এত কম দামে বিক্রি করলো? তাহলে আগে বেশি দামে বিক্রির কারণ কি? কারণ একটাই আর সেটি হচ্ছে সিন্ডিকেট। বাণিজ্য মন্ত্রী এব্যাপারে বলেন, রমজানে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবাহ করা হবে। স্টক চাহিদার চেয়েও বেশি আছে। দাম বাড়ার কোন কারণ নেই। রোজায় যে কোন মূল্যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবই। তিনি আরো জানান, রমজানকে সামনে রেেখ তিন স্তরে ছোলা, খেজুর, তেল, পেঁয়াজ,ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ডিলারের মাধ্যমে আমদানি করবে সরকার। সরকার ঢাকায় ২৫ টি ,চট্টগ্রামে ১০টি, সব বিভাগীয় শহরে ৫টি ও আন্যান্য শহরে ১৭৪ টি ট্রাকে করে টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করবে।  একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, একজন সাধারণ রোজাদার সারাদিন রোজা রেখেছেন, অভূক্ত অবস্থায় সে রিক্সা চালাল, বা মাটি কাটল, বা এমন কাজ করলো যা কায়িক পরিশ্রমের,  কাজটি করে তিনি যা পরিশ্রমিক পান, তা দিয়ে আগের দামেই সে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী কিনতে হিমশিম খেতেন। এখন দাম বেড়ে যাওয়ায় ইফতারি ও সেহরীতে তিনি তার স্ত্রী-পুত্রের পছন্দের খাবার কিনতে পারছেন না। সরকার প্রতি বছরই রোজাদারদের অসুবিধা দূর করার চেষ্ঠা করে। কিন্তু তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয়না। আমরা আশা করি এবার সরকার অভিনব পদ্ধতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ক্রেতা সাধারণের অপরিমেয় কষ্ট দূর করবে। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  প্রভাষক ও সাংবাদিক, কুমিল্লা।

 


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.