মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা ফিরে আসুক


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা ফিরে আসুক


মমিনুল ইসলাম মোল্লা

যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশকে প্রদত্ত জিএসপি বৃগস্পতিবার অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে জিএসপি বাতিলের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে আসে। সে সময় বাণিজ্য মন্ত্রী জিএম কাদেরকে চিঠি দেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী রন কার্ক। গত মার্চে বাংলাদেশ ওয়াশিংটনে জিএসপি বিষয়ক শুনানিতে অংশ নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে জিএসপি বহাল রাখার দাবী জানায়। কিন্তু সাভারের ভবন ধ্বসের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পেয়ে আসছে। মার্কিন বাজারে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১ শতাংশের মতো পণ্যের শুল্ক সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে বংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাত এই সুবিধার আওতায় পড়েনা। জেনারেলাইজেশন সিস্টেম অব প্রেপারাইজেশন বা জিএসপির অর্থ ডিউটি প্রি এক্সেস বা শুল্ক মুক্ত প্রবেশাধিকার। অর্থ্যাৎ বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করলে আমেরিকার ব্যবসায়ীদের কোন প্রকার শুল্ক পরিশোধ করতে হয় না। ফলে পণ্য মূল্য কমে যায় এবং পণ্যটি সহজে সেদেশে প্রবেশ করতে পারে। বাংলাদেশের কুটির শিল্পজাত ও অপ্রচলিত পণ্য সহজেই আমেরিকার বাজারে প্রবেশ করতে পারে। কেননা এসব পণ্যে সম্পূর্ণরুপে জিএসপি সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। বাংলাদেশের পরিবর্তে নতুন করে জিএসপি সুবিধা পেতে পারে ভিয়েতনাম ও ভারত। সম্প্রতি কলম্বিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট থেকে জিএসপি সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। আশির দশকে শ্রমিকদের জিএসপি অধিকার সুরক্ষার মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হওয়ায় অন্তত ১৩টি দেশের জিএসপি সুবিধা আংশিক বা পুরোপুরি বাতিল করা হয়। মিয়ানমার ও বেলারুশের ক্ষেত্রে মার্কিন সরকার জিএসপি বাতিল করেছিল। শ্রম ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন মেনে চলে এমন দেশগুলো  “জিএসপি প্লাস ওয়ান ”  নামে একটি বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। বিশেষ করে ইউরোপের ক্ষেত্রে এসুবিধা প্রযোজ্য। এসুবিধা থেকে শ্রীলংকার নাম প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য আমেরিকায় জিএসপি সুবিধা পায়না। তবে ইউরোপে সম্পূর্ণরুপে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। ইউরোপের আমদানীকারক এসব পণ্য তাদের দেশে খালাস করতে কোন প্রকার কর পরিশোধ করতে হয় না। বাংলাদেশ গার্মেন্টস পণ্যের ৫৭% ইউরোপে রপতানি করে। বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা ৬ বছরের জন্য বাতিল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি একই কাজ করে তাহলে দেশের পোশাক শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।


          উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানি করতে পারে। তবে পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ কোনপ্রকার সুবিধা পায় না। এর আগে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেও সেখানকার পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরোধীতার কারণে সেটি হয়নি। গত বছর গার্মেন্টস খাতে রফতানি হয়েছে ১৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১১-১২ অর্থ বছরে বাংলাদেশ মোট রফতানি করেছে ২হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে ৫০০ কোটি ডলার। জিএসপি সুবিধাপ্রাপ্ত রফতানি পণ্যগুলো হচ্ছে তামাকজাত পণ্য, খেলাধুলার সামগ্রী, কিচেন সামগ্রী, ও প্লাস্টিক পণ্য। গেøাবাল ওয়ার্কার্স ফাইন্ডেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাণিজ্যবিষয়ক বিশ্লেষক এড গ্রেসার জানান, গত বছর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে তাবু, গলফ খেলার সামগ্রী, প্লেটসহ ৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে। এর ওপর জিএসপি সুবিধা অনুযায়ী ২০ লাখ ডলার শুল্ক ছাড় পেয়েছে। ইউরোপে বাংলাদেশী পোশাক শিল্পের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ইউরোপের বাজারের উপর নির্ভর করেই আমাদের পোশাক শিল্প আজ ২০ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিনত হয়েছে। ইউরোপ বাদে যেসব দেশে আমাদের পণ্য যাচ্ছে সেগুলো হচ্ছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, ও কানাডা।        

তৈরি পোশাক শিল্পের সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা আশা করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ১শ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সফিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের গতি ধরে রাখতে পারি এবং সঠিকভাবে বাজার সুবিধা কাজে লাগাতে পারি তাহলে আগামী কয়েক বছরে চীনে ১শ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করতে সক্ষম হব।’স¤প্রতি চীনের চায়না ন্যাশনাল গার্মেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ঘুরে গেছে। তারা এদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতা ও উৎপাদন কার্যক্রম স্বচক্ষে দেখেছে। তারা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নতি দেখে খুবই খুশি। বিশেষ করে কারখানার পরিবেশ, পণ্যের মান ও সার্বিক ব্যবস্থায় তারা খুবই সন্তুষ্ট।

মার্কিন সংস্থা এএফএল-সিাআইও বা ( দি আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার এন্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন ) ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অবাধ সুযোগ-সুবিধা (জিএসপি) বাতিলের দাবিতে প্রথম আবেদন করে। এ সংগঠনের বাণিজ্যবিষয়ক প্রধান সেলেস্ট ড্রেইক বলেন-গত নভেম্বরএ তাজরিন ফ্যাশন্সে অগ্নিকান্ডে ১১২ জন ও সম্প্রতি রানা প্লাজায় ভবনধ্বসে ১ হাজার ১২৯ জনের বেশি ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় ওবামা প্রশাসন বাণিজ্যিক সুবিধা বাতিল করতে পারে বা কমিয়ে দিতে পারে। মার্কিন রাষ্ট্রদুত ড্যান ডবি  মজিনা বলেছেন-বাংলাদেশে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার না থাকাসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণে ব্যার্থ হওয়ায় জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তা এখনও কার্যকর করা হয়নি। বাংলাদেশ সরকার ও শিল্প মালিকগণ শর্তগুলো পূরণ করলে জিএসপি সুবিধা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে সিনেট কমিটির এক শুনানিতে জিএসপি সুবিধা থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে জোরালো সুপারিশ করেন একমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর রবার্ট মেনডেজ। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার রুপরেখা চুক্তির (টিকফা) জিএসপির সাথে কোন সনম্পর্ক আছে কিনা খতিয়ে দেখতে হবে। শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা ও শ্রমমানের যে বিষয়গুলো ও কারণে জিএসপি সুবিধা বাতিল হচ্ছে সেগুলো টিখফার মধ্যে ও রয়েছে। কিছু কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের মতপার্থক্য রয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের টিখফা সইয়ের ব্যাপারে মন্ত্রিসভার চুড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কবে তা অনুমোদিত হবে অথবা আদৌ হবে কিনা তা সুস্পষ্ট নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দিপু মনি সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরের সময় জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে অনুরোধ জানালে তিনি তাকে এব্যপারে আশ্বস্ত করেন।  ৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যবিষয়ক সিনেট কমিটিতে এ বিষয়ে চুড়ান্ত শুনানি হয়। এতে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ সিলিস্ট ড্রক তাদের অভিযোগের পক্ষে বলেন, বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতি খুবই দুর্বল। এখানে শ্রমিক ইউনিয়ন ও সম্মিলিত দর কষাকষির বিরুদ্ধে নিষ্পেষন চালানো হয়। সে সঙ্গে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সমস্যা , হয়রানির বিরুদ্ধে দুর্বল আইনি ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন। এছাড়া শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যা ও তাজরিন ফ্যাশনে ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে মার্কিন সরকার চিঠি দেয়। চিঠিতে ট্রেড ইউনিয়ন চালু ও শ্রমিক নিরাপত্তা উন্নত করার শর্ত দেয়। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে এখন দুর্দিন চলছে। ৫৫০০ গার্মেন্টস এর মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র ৩৫০০ টি। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস, বিদ্যুৎ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে এ সংকট প্রকট হচ্ছে। এছাড়া চাঁদাবাজি, ঝুটব্যবসা, ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শ্রমিক ব্যবহার এ শিল্পকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প্যসিফিক জিন্স এর চেয়ারম্যান বিশিষ্ট রফতানিকারক মোঃ নাসির উদ্দিন বলেন- বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর এমনিতেই দুর্দিন অতিক্রম করছে।এখন আমেরিকা যদি জিএসপি নিয়ে কোন পদক্ষেপ নেয় তাহলে তা আমাদের জন্য আরো বড় ক্ষতি বয়ে আনবে। ইমেজ একটি বড় সম্পদ। যা টাকা দিয়ে সৃষ্টি করা যায় না। পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমই এ বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বেনা। তবে এ নেতিবাচক প্রভাব অন্যান্য দেশে পড়বে।

লেখক: মমিনুল ইসলাম মোল্লা,প্রভাষক, ক্যাম্পেনার সিডিএলজি বসধরষ ঃ 






শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.