প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যায় ও জাতীয় উন্নয়ন

প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যায় ও জাতীয় উন্নয়ন
মমিনুল ইসলাম মোল্লা,

আমাদের দেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পরিমান বাড়ছে, সাথে সাথে বাড়ছে রেমিটেন্সের পরিমান। কিন্তু প্রবাসীদের ঘাম নিসৃত টাকা উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানোর ব্যপারে সরকারি কোন উদ্যোগ নেই।  যে ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের টাকা দেশে এনে পরিবারের সদস্যদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে তাদেরও কোন পরামর্শ নেই। ফলে প্রবাসী বা তাদের পরিবারের সদস্যরা যে যেখানে ভালো মনে করেন সেখানেই বিনিয়োগ করছেন। বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে , প্রবাসীদের আয় থেকে বাংলাদেশের জিডিপির ১০% আসে। গত ৪ বছরে এশিয়ার অন্যান্য দেশে রেমিটেন্সের পরিমাণ গড়ে যেখানে ছিল ৭.১% সেখানে বাংলাদেশে ছিল প্রায় ১১%। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে রেমিটেন্সের পরিমান ছিল ১৪৪৬ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ১০ বছরে দেশে রেমিটেন্স এসেছে ৫ হাজার ৯ শ কোটি ডলার বা ৩ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ৯ বছরের ব্যাবধানে রেমিটেন্স কয়েকগুণ বেড়ে ২০১০ সালে ১১০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। যা মোট জিডিপির ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডঃ সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রেমিটেন্স বাড়লেই দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন হবে এমন ভাবা ঠিক নয়। রেমিটেন্সের টাকায় শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা বা গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে ব্যায় করতে হবে। এটি সম্ভব হলে একদিকে যেমন ওই প্রবাসি লাভবান হবেন অন্যদিকে দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দেশর অথৃনীতি সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে। প্রবাসীরা অবস্থানকারী  দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করেন। কেউ কেউ ১৬ ঘন্টাও কাজ করেন। এধরণের পরিশ্রমী মানুষগুলো স্বাভাবিকভাবেই দেশে ফিরে বেকার থাকতে চান না। তারা উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োজিত না হলেও ব্যবসায়িক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেন। কিন্তু এদেশে ব্যবসা করারর অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেকেই সফল হতে পারেন না। 
২০০৪ সালে আইওলও এর জেনেভা থেকে প্রকাশিত ডঃ তসনিম সিদ্দিকীর গবেষণায় দেখা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ২৬.২৬ শতাংশ ব্যায় করেন জমি কেনা এবং বাড়ি নির্মাণে। ৪.৭৬ শতাংশ ব্যবসায়, সঞ্চয় করেন ৩.০৭ শতাংশ।  সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যয় কররেন ৯ শতাংশ অর্থ। প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠালে স্ত্রী , ছেলে-মেয়েরা তা দিয়ে বিলাসিতায় মেতে উঠেন। তারাও দেশে আসলে আকিজ বিড়ির পরিবর্তে শেখ সিগারেট, আর যারা রমনা সিগারেট খেয়ে অভ্যস্ত ছিলেন তারা বেনসন সিগারেট খান। শুধু তাই নয় বাজারের বড় মাছটি তাদের চাই- ই চাই। সম্প্রতি একটি গ্রাম্য বাজাওে ১০০০ টাকা কেজি দরে ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল। গ্রামে এত দামে মাছ কে কিনবে ? জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন “ বাজারে এখন বিদেশী টাকা উড়ছে। কেনার লোকের অভাব নেই। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে প্রবাসীরা ভূমিকা রাখতে পারেন শিক্ষা, সাস্থ্য, অবকাঠমো, সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানী, বায়োগ্যাস, ফ্যাশন ডিজাইনিং ইত্যাদি খাতে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় প্রবাসীরা হন্যে হয়ে জমি খুঁজেন। একই এলাকায় প্রবাসীর সংখ্যা বেশি হলে একই জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগীতা লক্ষ্য করা যায়।  ফলে জমির দাম হুহু করে বাড়তে থাকে। কোন কোন এলাকার জমির দাম প্রবাসীদের কারণে বেড়ে ঢাকার জমির চেয়ে বেশি দাম হয়ে গেছে। ২০০৬-২০০৯ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে একটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। তাতে ৬ হাজার প্রবাসীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হলে তারা আত্মকর্মসংস্থানে নিজেদের নিয়োজিত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিআইআরএ এর গবেষণায় দেখা যায় তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে ৭২ % শতাংশই মনে করেন যে তারা ব্যবসায় ব্যার্থ হবেন। ফলে অনেকে শুরুই করতে চান না। সিপিডি এর নির্বাহী পরিচালক ডঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রবাসীরা বেশিরভাগ স্বল্প আয়ের হওয়ায় তাদের একার পক্ষে কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হয় না। কুমিল্লার দেবিদ্বারের কুয়েত প্রবাসী যুবক আঃ রহিমের পর্যাপ্ত পরিমান ধানের জমি ছিল, পুকুরে মাছ ছিল, কেরাসিন তৈল আর লবন বাদে সাপ্তাহিক হাটে যেতে হতোনা। বিদেশ থেকে আসার পর বাড়িতে বিল্ডিং দিয়েছেন, ঘরে ফ্রিজ আছে, ৩টি মোবাইলে আনবরত কথা চলে, কিন্তু যে জমিটুকু বিক্রি করে বিদেশে গিয়েছিলেন, সেটি আর কিনতে পারেন নি। শুধু রহিম নয় অধিকাংশ প্রবাসীর একই অবস্থা। তাই তাদেরকে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ সহ সরকারিভাবে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে  হবে। তাতেই দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  প্রভাষক ও সাংবাদিক, কুমিল্লা।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.