জেলায় জেলায় গণতন্ত্রায়ণ ও জনগণের ক্ষমতায়ন
মমিনুল ইসলাম মোল্লা
উপজেলা , পৌরসভা , ও ইউনিয়ন পরিষদের পর স্থানীয় সরকারের অন্যতম ইউনিট জেলা পরিষদের নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার জোরালোভাবে ভাবছে। যে কোন সময় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তাই জেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নড়েচড়ে বসছেন। তবে এ নির্বাচনে নির্বাচনী আমেজ থাকবেনা। কারণ এটি সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে না। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মৌরিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ সাধারণ জনগণ ভোট দেবেনা। তবে নির্বাচনের আগে প্রশাসক ও নিয়োগ হতে পারে। ২৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেন –সরকার সকল জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান নিয়োগ করবে। তবে নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের ব্যাপারে অনেকেই আপত্তি করছেন। কেননা সরকারিভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হলে সরকার দলীয় সদস্যরাই নিয়োগ পাবেন।এ উপমহাদেশে জেলা প্রশাসনের প্রথম সূচনা করেন কে? এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে স¤্রাট আকবরের নামটিই প্রথম আসে। তবে তিনি জেলা প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ রুপ দিতে পারেন নি। ব্রিটিশগণ তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসনকে ব্যবহার করে। ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি অনুযায়ী জেলায় ৬ জন কালেক্টর রাখার বিধান করা হয়। এর মধ্যে ৩ জনকে এক সম্প্রদায় এবং অন্য ৩ জনকে অন্য সম্প্রদায় থেকে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস এর ব্যবস্থা করা হয়। বিশেষ করে রাজস্ব প্রশাসনকে কেন্দ্র করেই জেলা প্রশাসনের বিকাশ ঘটে। আধুনিক জেলা প্রশাসনের ভিত্তি প্রস্তর ১৭৭২ সালেই স্থাপিত হয়। ১৭৯০ সালে প্রতিটি জেলায় মাল আদালত নামে একটি রাজস্ব আদালত স্থাপন করা হয়। জেলা কালেক্টর এ আদালতের প্রধান ছিলেন। ১৭৯৩ সালে কারেক্টরের বিচার ক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়। এবং ক্ষমতা জেলা জজ বা বিচারপতির নিকট অর্পণ করা হয়। পাকিস্তান আমলে জেলা প্রশাসনে পরিবর্তন আসে। ১৯৫৯ সালে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশ প্রবর্তনের ফলে জেলা প্রশাসককে স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে প্রত্যেক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট হতে হয়। তখন জেলা প্রশাসনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ১৯৬০ সালে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের উক্তি অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের কাজ কোন কোন শাখায় ৩০০% থেকে ৯০০% বৃদ্ধি পায়। ১৯৬১ সাল থেকে সকল জেলা প্রশাসককে ডেপুটি কমিশনার পদবীতে ভুষিত করা হয়। ১৯৪৭ থেকে ৬০ সাল পর্যন্ত জেলা প্রশাসকগন জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট কালেক্টর ও ডেপুটি কমিশনার নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭২ সালে জারিকৃত রাষ্ট্রপতির ৭নম্বর আদেশ দ্বারা স্থানীয় সরকার কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয় । জেলা পর্যায়ে পদাধিকার বলে ডেপুটি কমিশনারকে চেয়ারম্যান করার বিধান রাখা হয়।
১৯৭৬ সালে অধ্যাদেশের মাধ্যমে নির্বাচিত সদস্য সরকারি কর্মকর্তা , মহিলা সদস্য ও তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত একজন চেয়ারম্যান এক জন ভাইসচেয়ারম্যানের সমন্বয়ে জেলা পরিষদ গঠনের বিধান করা হয়। বাংলাদেশ শাসনামলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। ১৯৮৮ সালে প্রণীত স্থানীয় সরকার জেলা পরিষদ)আইনে জেলার সংসদ সদস্য , উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও পৌর চেয়ারম্যান মনোনীত সাধারণ ও মহিলা সদস্য এবং কতিপয় সরকারি কর্মকর্তাকে জেলা পরিষদের সদস্য করার বিধান রাখা হয়। সরকার চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার বিধান রাখা হয়। কার্যকাল রাখা হয় ৩ বছর। শেখ হাসিনার শাসনামলে জেলা পরিষদ আইন - ২০০০ প্রণীত হয়। ১৭ নং ধারায় পরোক্ষ পদ্ধতিতে চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচনের বিধান রাখা হয়। ১৯৯১-৯৬ , ২০০১-২০০৬ সময়ে জেলা পরিষদের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালে তৈরি জেলা পরিষদ আইনে পরোক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগের বিধান করা হয়। জেলা পরিষদ আইন ২০০০ এ এবিষয়টির কোন পরিবর্তন করা হয়নি। এ আইনের ৮২ নং ধারায় বলা হয়েছে ”এই আইন আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছু থাকুক না কেন এই আইনের বিধান অনুযায়ী জেলা পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসক জেলা পরিষদের কার্যাবলী সম্পাদন করতে পারবেন।”জেলা পরিষদ আইন ২০০০ অনুযায়ী জেলা পরিষদ চলছে। আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধীতাকারীর বয়স হবে কমপক্ষে ২৫ বছর। দেউলিয়া ঘোষিত হবার পর দায় হতে মুক্ত হতে হবে। এছাড়া তার নিকট ব্যাংক বা কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোন ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ থাকতে পারবে না। জেলা পরিষদ একজন চেয়ারম্যান , নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের নিয়ে গঠিত। সরকার ২০০০ সালের আইন পরিবর্তন করে পরিষদের সদস্য সংখ্যা , পরিষদের কার্যপরিধি , দায়িত্ব ও ক্ষমতা সম্পর্কে কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে জেলা পরিষদের আওতাধীন কাজসমুহ হচ্ছে-আন্ত প্রশাসনে অভিাবকের ভুমিকা পালন , নেতৃত্ব , উন্নয়নসভা , মাসিক আইনশৃংখলা সভা পরিচালনা , উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ , পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সাথে সমন্বয় সাধন।
বর্তমানে ১৪ টি মন্ত্রনালয়ের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারী এবং তাদেরকার্যাবলী জেলা পরিষদে ন্যাস্ত করার প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে। বর্তমানে জেলা পরিষদের কার্যকাল ৫ বছর। সরকার যুক্তিসঙ্গত কারণে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণ করতে পারে। কোন কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূণ্য হলে ৬০ দিনের মধ্যে তা পূরণের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে জেলা পরিষদে কোন নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে চার স্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার রয়েছে। এগুলো হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ , উপজেলা পরিষদ , জেলা পরিষদ ও বিভাগ । বিভাগকে স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ ইউনিট হিসেবে ধরা হলেও এতে যথেষ্ট ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ , নির্বাচিত প্রতিনিধির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। সর্বোচ্চ ইউনিট হিসেবে বিভাগকে অপ্রয়োজনীয় বিবেচিত হলে তার স্থলে জেলাকে সর্বোচ্চ ইউনিট করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিভাগকে বিলুপ্ত করতে হবে। বিভাগ বিলুপ্ত হলে জেলা হবে গ্রামীণ নগরীয় -স্থানীয় ইউনিট। ইউনিয়ন ও নগর উভয় ইউনিট হবে সর্ব নি¤œ ইউনিট। আর উপজেলা হবে মধ্যবর্তী ইউনিট । সিড্এিলজি গবেষক ডঃ আবু তালেব প্রণীত গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রুপরেখা অনুযায়ী ”জেলা সরকারের রুপরেখা অনুযায়ী ” জেলা পরিষদকে জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছাতে হলে একে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করতে হবে। ১. জেলা সংসদ ২ . জেলা নির্বাহিক বিভাগ ৩. বিচারিক বিভাগ।বিচারিক বিভাগকে অন্য দুবিভাগ থেকে পৃথক ও স্বাধীন থাকবে। জেলা নির্বাহী বিভাগের চেয়ারম্যান ও সদস্যগন জনগণের প্রত্যোক্ষ ভোটে নির্বািিচত হবেন। তিনি জেলা সংসদের সদস্য হবেন না। জেলা সংসদের সদস্যদের ভোটে একজন সভাধিপতি হবেন। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা থেকে দুজন করে সংসদ সদস্য থাকবেন। তাদের মধ্যে একজন হবেন অবশ্যই নারী সাংসদ। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বটম আপ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। প্রতিটি স্তরের ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া উচিত। ইউনিয়ন যে কাজগুলো করতে পারবেনা উপজেলা সেগুলো করবে , উপজেলা যেগুলো করতে ব্যার্থ হবে জেলা সেগুলো করবে এবং জেলা যেগুলো করতে পারবে না সেগুলো বিভাগ করবে। সরকার সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচন না করে আইয়ুব খান প্রবর্তিত বেসিক ডেমোক্রেসির মাধ্যমে নির্বাচন করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৯/১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমুহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করবে। ১৫২ অনুচ্ছেদে জেলাকে প্রশাসনিক একাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সরকার প্রশাসক নিয়োগ দিলে তা শাসনতান্ত্রিকভাবে বৈধ হবেনা।
জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা উপমন্ত্রীর পদমর্যাদার সমান। এ প্রতিষ্ঠানটির বয়স প্রায় ২০০ বছর হলেও এতে গণতন্ত্র পুর্ণাঙ্গতা পায়নি। পাকিস্তান আমলের ১০ বছর বাদে কখনও এতে নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল না। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী জনসাধারণ প্রার্থী নিয়োগ করবে না। প্রত্যেক জেলার অন্তর্ভুক্ত সিটি কর্পোরেশন (যদি থাকে) এর মেয়র কমিশনারগন , উপজেলা পরিষদেও চেয়ারম্যান , পৌরসভার চেয়ারম্যানও কমিশনারগন এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যগন সমন্বয়ে উক্ত জেলা পরিষদেও চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচরনর জন্য নির্বাচকমন্ডলী গঠিত হবে। জেলা পরিষদকে নাম মাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনসাধারণ দেখতে চান না। একে স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী করতে হবে। আর স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য প্রয়োজন অর্থ । প্রয়োজনীয় অর্থ থাকলে জেলা পরিষদের অর্থ দিয়ে স্টাফ খরচ চালিয়ে ও উন্নয়ন কাজ করা সম্ভব হবে। আর এজন্য করের আওতা বাড়িয়ে ১০০% কর আদায় নিশ্চিত করতে হবে। তাই জেলা পরিষদকে জনকল্যাণকামী করতে হলে সকলের সহযোগীতা প্রয়োজন। আর যদি সেটিকে উপজেলা পরিষদের মতো ”ঠুটো জগন্নাথে ”পরিনত করা হয় তাহলে জেলা পরিষদের নির্বাচন করে কোটি কােটি টাকার শ্রাদ্ধ করা উচিত হবে না।
লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, প্রভাষক ও সাংবাদিক ,গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের ক্যাম্পেনার , এলাহাবাদ ইউনিয়ন , কুমিল্লা , চট্টগ্রাম বিভাগ