প্রাচীন সমতটের রাজধানী দেবিদ্ধারের বরকামতা মমিন মোল্লা।।

প্রাচীন সমতটের রাজধানী দেবিদ্ধারের বরকামতা
মমিন মোল্লা।।

প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থানেরই নামকরণের একটি তাৎপর্য রয়েছে। সমতট ও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। হিউয়েন সাঙ এর বর্ণনা অনুযায়ী আসামের দক্ষিণে একটি বিশেষ  এলাকা ছিল যা  ছিল সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। সম্ভবত উত্তরের উচু-নিচু অঞ্চলের চেয়ে এই অঞ্চলের নদী বিধৌত অঞ্চল ছিল সমতল। সেই থেকে সমতট নামটি প্রচলিত হয়েছিল ।  আশ্রাফপুরে প্রাপ্ত দুটি তা¤্রশাসনে এবং দেউলবাড়ির মূর্তি লেখা হতে সমতটের বৌদ্ধ খড়গ রাজবংশ ( ৬২৫-৭২৫) সমন্ধে আমরা অবগত হই। এতে রাজা খড়েগদ্যম, জাত খড়গ ও দেব খড়গের নাম জানা যায়। দেবিদ্ধারের বরকামতা ছিল এর কেন্দ্রবিন্দু। হিউয়েন সাঙ ময়নামতি অঞ্চলে ৩৫টি শিক্ষাকেন্দ্র ( বিহার) দেখতে পান। তখন তিনি সমতট তথা কুমিল্লাবাসীকে প্রবল শিক্ষানুরাগী বলে আখ্যায়িত করেন। 
নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার অধশ্রাফপুর গ্রামে খড়গ রাজবংশের দুটি তা¤্রশাসন পাওয়া গেছে । তা¤্রশাসনে উল্লেখিত একটি স্থানের নাম “জয় কর্মকান্ত। ডঃ নলিনীকান্ত ভট্টশালী “জয়কর্মকান্তকে “ “বড়কামতা ” গ্রাম বলে সনাক্ত করেন। বড় কামতা নামক স্থানটি কুমিল্লা শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে দেবিদ্বারে অবস্থিত। আশরাফপুর লিপি অনুযায়ী খড়গ রাজবংশ সমতট রাজ্য শাসন করেছে বলে জানা যায়। এ রাজবংশের উল্লেখযোগ্য রাজাগণ হচ্ছেন খড়গোদ্যম, জাতখড়গ, দেবখড়গ, রাজ রাজভট্ট । ডঃ নীহারঞ্জন রায় মনে করেন খড়গ বংশীয় রাজারা প্রথমে সম্ভবত বঙ্গে রাজত্ব করেন পরবর্তীতে সমতটে আসেন। ইতিহাসের সিড়ি বেয়ে পেছনের দিকে গেলে দেখা যায় সমতট রাজ্য দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত টিকেছিল। ত্রিপুরা রাজ্যও তখন সমতটের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আনুমানিক খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকে প্রাচীন বাংলার বঙ্গ ও সমতট অঞ্চলে শাসন করে। এ রাজ বংশের সূচনা করেন খড়গদ্যেম ( আনুমানিক ৬২০-৬৪০) তার পর শাসন করেন তার পুত্র জাতখড়গ ( আনুমানিক ৬৪০-৬৫৮) খ্রিঃ তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন তার পুত্র দেবখড়গ ( আনুমানিক ৬৫৮-৬৭৩) পৌত্র রাজভট্ট ( ৬৩০-৬৯০)। বর্তমানে বরকামতা দেবিদ্ধারের একটি ইউনিয়ন। এর আয়তন ৮.৬৬ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা ১০৫৪৭ জন। শিক্ষার হার  শতকরা ৪৬.৫ ভাগ।
সমতট ছিল তৎকালীন সময়ের একটি বিশাল রাজ্য। চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বর্ণনা অনুযায়ী এ রাজ্যের সীমা ছিল ৮০০ কিলোমিটার। বরকামতা নামে কুমিল্লাতে আরো গ্রাম থাকলেও দেবিদ্ধারের বরকামতাই যে সমতটের রাজধানী ছিল সেটি এখান থেকে প্রাপ্ত পুরাকির্তীর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। বরকামতার ২ কিলোমিটার উত্তর- পশ্চিমে প্রায় ২৫ ফুট উচু ঢিবি রয়েছে। এ উপরে একটি শিব লিঙ্গ রয়েছে। প্রতœতাত্তিকদের ধারণা এটি ৭ম শতকের চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ বর্ণিত স্মৃতি বিজড়িত বৌদ্ধ স্তুপের ধ্বংশাবশেষ হতে পারে। বরকামতার ২ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত বেলাশরে বোধিস্বত্ত আলোকিতস্বরের একটি চমৎকার প্রস্তর মূর্তি পাওয়া গেছে । ৬ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত শুভপুরে বজুপানি বোধিস্বত্তের একটি প্রমাণ সাইজের মূর্তি পাওয়া গেছে। বরকামতার ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে পিহর গ্রামে মহাযানি বৌদ্ধদেবী মবীচীর একটি মনোরম মূর্তি আবিষ্কার হয়েছে। 
 সমতটের পার্শ্ববর্তী রাজ্য ছিল হরিকেল ও বঙ্গ।  বরকামতা ছিল ক্ষিরোদ নদীর তীরে দেব পর্বতের পাশে । এটি গোমতি নদীর সাথে যুক্ত ছিল। তবে ক্ষিরোদ নদীকে বর্তমানে দেখে চিনার কোন সুযোগ নেই। চান্দিনা বাসস্ট্যন্ডের পাশে বাগুর গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। এটিই ঐতহাসিক ক্ষিরোদ নদী। সাবেক বৃহত্তর কুমিল্লা , নোয়াখালি, চট্টগ্রাম জেলার বিশাল অংশ নিয়ে সমতট রাজ্যের অবস্থান ছিল। এ রাজ্যটি প্রায় ৫০০ শত মাইলব্যাপী ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে এটি হরিকেল রাজ্যের দখলে চলে যায়। বিশিষ্ট লেখক অতুুল চন্দ্র রায় ও প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সংকলিত  “ ভারতবর্ষের ইতিহাস ” বইয়ে এল্লেখ করা হয় ৫০০ বছর টিকেছিল সমতট রাজ্য। সপ্তম শতাব্দীতে এর রাজধানী ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের কামড়া অঞ্চলে। 
বাংলার প্রাচীন জনপদগুলো সমতট, বঙ্গ, রাঢ়, গৌড় , হরিকেল, কোনটা কোথায় ছিল অর্থাৎ কোন কোন অঞ্চল নিয়ে এগুলো গঠিত ছিল এ সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া খুব কঠিন। ঐতিহাসিকদের ধারণা গঙ্গা-ভাগিরথীর পূর্বতীর থেকে শুরু করে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রক’লবর্তী অঞ্চলই ছিল সমতট । কুমিল্লা শহর থেকে ১২ মাইল পশ্চিমে ছিল এর রাজধানী । তাই দেবিদ্ধারের বরকামতাই যে সমতটের রাজধানী এ কথা আমরা বলতে পারি। 
লেখকঃ প্রভাষক, সাংবাদিক ও ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা। 


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.