রুপসী বাংলা বুধবার, মমিনুল ইসলাম মোল্লা, ০৮ অক্টোবর ২০০৮ ইং, ২৩ আশি^ন ১৪১৫
আমরা কি পুরোপুরি কুসংস্কার মুক্ত হতে পেরেছি? বাস্তব জীবনে বিজ্ঞানের পতিফলন ঘটেনি এমন লোকের সংখ্যা কম নয়। এখনও আমরা ঝার-তাবিজ মাদুলি কিংবা পাথরের মাধ্যমে মঙ্গল অমঙ্গলে বিশ^াস করি।
দৈনিক পত্রিকা খুললেই বিভিন্ন ভুল বিশ^াসের খবর পাওয়া যায়। হয়তো কেউ স্বপ্ন দেখেছে যে তার ছেলেকে দেবতার নামে বলি দিয়ে ঘরের মেঝে রক্ত ছিটিয়ে দিলে তার মঙ্গল হবে অথবা "স্বর্নের কলসী" পাওয়া যায়। সে অনুযায়ী মা তার নিজ সন্তানকে হত্যা করে।
মহিলারাই কুসংস্কারে বেশী বিশ^াস করে। নারী বিশ^াস করে ঃ মেয়েদের চুল আচঁড়বার পর ফেলে দেয়া চুল থুতু দিয়ে না ফেললে কুনজর লাগে, স্বামীর আগে ভাত খেলে অমঙ্গল হয়, প্রসূতিকে ৪০ দিন আলাদা ঘরে আগুন ও লোহাসহ রাখতে হবে, মুসলিম নারীকে মুখে তিন তালাক দিলে হিল্লা দিয়ে আবার গ্রহণ করা যাবে। এছাড়া চন্দ্র বা সূর্য গ্রহণের সময় যতক্ষন গ্রহণ চলে ততক্ষন বসতে পারবেনা, খেতে পারবে না। এমনকি কিছু কাটতে বা রাঁধতে পারবেনা, যমজ কলা খেলে যমজ সন্তান হয়, বিয়ের পর নাকফুল পরতেই হবে, গারে টোল পড়লে স্বামী খেকো বলা হয় এবং মেয়েদের গায়ে প্রজাপতি বসলে অথবা হাত থেকে তৈল পড়ে গেলে বুঝতে হবে বিয়ে আসন্ন, শিরপুজা করলে বলিষ্ঠ স্বামী পাওয়া যায় ইত্যাদি। পুরুষরাও কুসংস্কার মুক্ত নয়। খনার বচণে আছে হাঁচি টিকটিকি, বাধা/ যে মানেনা সে গাধা। অথ্যাৎ হাঁচি অশুভ, টিকটিকির ডাক সত্যের প্রতীক আর চলতে হিয়ে বাধা পেয়ে ফিরে এসে আবার যাত্রা শুরু করতে হবে এগুলো যে মানেনা তাকে বাধা বা নির্বোধ বলা হয়েছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত অনেক পুরুষই কুসংস্কার মেনে চলেনা যেমন- বুকে চুল থাকা পুরুষ দয়ালু, সীমারের বুকে চুল ছিলনা, তাই চুল না থকলে নির্দয়, চুল খাড়া লোক বদমেজাজী, টাকওয়ালা পুরুষ অধিক জ্ঞানী ও ধনী, মাথায় বেশী পাক থাকলে অধিক বিয়ের সম্ভবনা থাকে এবং ছেলেরা গালে হাত দিয়ে বসলে বউ মারা যায়।
শিশুদেও নিয়েও রয়েছে নানা কুসংস্কার। ্এগুলোর মধ্যে রয়েছে সন্ধার সময় ছোট শিশুকে খোল যায়গায় বাইরে নেয়া নিষেধ, শিশুর চোখে মোটা করে কাজল টেনে দিলে চোখ টানা, টানা হবে, শিশু হঠাৎ কেঁদে উঠলে গায়ে থু থু দিতে হবে, পর পর মারা যাওয়া সন্তানের পর ছেলে হলে কান ছিদ্র করে স্বর্ণের রিং দিতে হবে, ছেলে দেখথে মায়ের মতো এবং মেয়ে দেখতে বাবার মতো হলে ভাগ্যবান হয়, শিশুকে ডিঙ্গিয়ে গেলে সে আর লম্বা হয় না, শিশু ভয়ং পেলে দায়ের আগায় লবন রেখে চেটে খেতে হয়, শিশু জন্মের সময় বা চল্লিশ দিন না গেলে তাকে বাড়ির বাইরে নেয়া যায় না।
আমাদের যাপিত জীবনেও রয়েছে নানা কুসংস্কার। যেমন ঃ রাতে খাবারের পর এটো পানি বাইরে ফেলতে নেই, রাতে গাছ থেকে ফুল বা ফল পাড়তে নেই, রাতে কাউকে ধার দিলে শীঘ্রই গরীব হওয়ার সম্ভবনা। ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখলে আয়ু কমে, চুলার আগুনে থু থু দিলে গলা ফোলে, দোকানে সকাল সন্ধ্যায় আগরবাতি জ¦ালাতে হয়, সন্ধ্যা বেলায় ঘরে সন্ধ্যাবাতি জ¦ালাতে হয়, রাতে কেউ এক ডাক দিলে দরজা খুলতে নেই, গামছা ও গেঞ্জী ছিড়লে সেলাই করতে নেই, হাত থেকে কোনো জিনিস পড়ে গেলে বুঝতে হবে অতিথি আসার জন্য রওয়ানা হয়েছে।
এছাড়া রয়েছে দানের ক্ষেত্রে শূন্য ভেঙ্গে দিতে হয় যেমন এক হাজার এক টাকা, দিনের শুরুতে এবং সন্ধ্যার শুরুতে ব্যবসায়ীকে বাকী দিতে নেই, গলার আজমীর শরীফের লাল সুতা পরে থাবালে কোনো বিপদ আসেনা, লাকী সেভেন এবং আনলাকি থার্টিন মেনে চরা, সাপকে আঘাত করে খিলি ভাঙ্গতে হবে, তুলা রাশির লোককে দিয়ে বাটি চালান দেয়া, জূজোর ফুল বইয়ে রাখলে লেখাপড়া ভালো হয়, দুজন ব্যাক্তির মাথায় মাথায় টককর লাগলে মাতায় শিং গজায় এবং ঘরের লক্ষি ঠিক রাখার জন্য দরকার শামনে গরু বা মোষ শিং ঝুলিয়ে রাখা।
বেঁেচ থাকার জন্য খাদ্যের বিকল্প নেই। এই খাদ্য নিয়ে রয়েছে নানা কুসংস্কার। এাঁ খাওয়া যাবেনা, এাঁ অবশ্যই খেতে হবে এ ধরণের রীতির অভাব নেই। এ ধরণের কয়েকটি হলো ঃ পরীক্ষার দিনে কলা, ডিম খাওয়া যাবেনা, খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই। বছরের প্রথম দিন ভালো খেলে সারা বছর ভালো খাওয়া যাবে, লবণ ও হলুদ ধার দিতে নেই, খাওয়ার সময় কাশি উঠলে বুঝতে হবে তাকে কেউ স্বরণ করছে। বাবা-মা জীবিত থাকতে মাছের মাতা খেতে নেই, আনারস খেয়ে দুধ খেলে মারা যায়, রাতে বা দুপরের খাবার নিয়ে বটগাছের বা তেতুল গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় সাথে রসুন দিতে হয়। পোকায় খাওয়া ফল খেলে সাঁতার শেখা যায় এবং গাছের প্রথম ফল মুরুব্বি বা পীর সাহেব কে খেতে দিতে হয়।
রোগ হলে চিকিৎসার কোনো বিকল্প নেই এবং চিকিৎসাটাও হতে হবে বিজ্ঞান সম্মত। কিন্তু আমাদের সমাজে এ নিয়েও রয়েছে বহু কুসংস্কার। যেমন-ফুটপাতে বিক্রি করা ঔষধে সব রোগ ভালো হয়। জন্ডিস রোগীকে মালাপড়া দেখা, কুকুর কামড়ালে থালপড়া, মানসিক রোগীকে জি¦নে ধরেছে বলে মণে করা মৃর্গী রোগীকে চামড়া বা জুতার গন্ধ শোঁকালে ভালো হয়। তাবিজ ও পানি পড়ার রোগ ভালো হয়, মাজারের পুকুরের পানিতে রোগমুক্তি। আমাদের সমাজে কুসংস্কারের ভিত এখনও বেশ মজবুত। কেউ জেনে কেউ বা না জেনে বিনা বাক্য ব্যয়ে এগুলো মেনে নিচ্ছি। কেউ কেউ হয়তো অপারগতার কথা বলেন বা তোমার কথাই ঠিক, তবে আমরা মুরুব্বিদের মুখে শুনেছি বুধবার বউ বাপের বাড়িতে গেলে অমঙ্গল হয়। তাই আজ যাওয়া যাবে না। আবার কেউ কেউ বলেন শিক্ষিত লোকেরাই দেশের সর্বনাশ করছে, নইরে যেটি আমরা যুগ যুগ ধরে মেনে এসেছি এখন সে গুলো না মানলে দেশে উন্নতি হবে কিভাবে।
বিশেষ করে ভাগ্য বিড়ম্বিত অসহায়, হতাশ ও দুর্বল ব্যক্তিদের মনেই কুসংস্কারের বাসা বাঁধে। তারাই ভাগ্য গণার জন্য যান জ্যেতিষের কাছে। মঙ্গল ও অমঙ্গদের জন্য যান পীর সাহেব থেকে পানি পড়া আনতে অথবা কবিরাজের কাছে যান ঝাড়ফুক করতে। ফলে এক শ্রেণীর লোক এগুলোকে পুজি করে আঙ্গুল কলা গাছ হচ্ছে।
কুসংস্কার ছড়ানোর জন্য আমাদের কবি সাহিত্যকগণ কিছুটা হলেও দায়ী। বিশেষ করে ভূত-প্রেত সংক্রান্ত কুসংস্কারগুলো গল্প উপন্যাস ও নাটকে বিশেষভাবে স্থান পায়। যদিও কৌতুহল বাড়ানোর জন্য এগুলো উপস্থাপন করা হয় তবুও ছোট ছোট ছেলে মেয়ের মধ্যে এর নেতিবচক প্রভাব পড়ে।
কুসংস্কার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের ইচ্ছা শক্তিই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান আমাদেরকে বিশেষভাবে সহযোগীতার করতে পারে।
লেখক ঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা
সাংবাদিক, কুমিল্লা
একটি প্রশিকা ফিচার