রোববার ঃ ২ মার্চ ২০০৮, ১৯ ফাল্গুন ১৪১৪ মমিনুল ইসলাম মোল্লা। দৈনিক রূপসী বাংলা-৩।
গারো আর খাসিয় পাহাড়ের পদদেশে পুরাতন সুরমা, কুশিয়ারা, বলাই, জালালপুর, সোমেশ^রী নদী বিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জেলা সুনামগঞ্জ। হাসন রাজার স্মৃতিধন্য সৃনামগঞ্জ। শুধু হাসন রাজার জন্য নয়, এখানকার অনেক স্থান রয়েছে যা পর্যটকদের জন্য হয়ে উঠতে পারে একটি চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটন শিল্পের জন্যে সরকারের এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়া অতান্ত জরুরী।
দর্শনীয় স্থানসমূহ ঃ ১) হাওর (টাঙ্গুয়ার হাওর) ঃ দেশের সবচেয়ে সুন্দর ও সমৃদ্ধ হাওরের নাম টাঙ্গুয়ার হাওর। এ হাওরটি বর্তমানে বিশ^ ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এ হাওরের আয়তন ২৪ হাজার একর। গাছ গাছালির ছায়ায় ঘেরা, পাখ পাখালির কুজনে মুখর এ হাওরটি ঘরে ফিরে বেড়ানোর জন্যে অপূর্ব জায়গা।
২) পাখি অভয়ারণ্য (বিরাম পুর) ঃ সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৬ কি. মি. পূর্বে বিরামপুরে শীতকালে গেলে দেখবেন অসংখ্য বিদেশী ও অতিথি চেনা-অচেনা পাখী। বিশেষ করে আবদুস্ শহীদের বাড়িটিকে বলা হয় পাখিবাড়ি। সারাদিন চরে বেড়া-নোর পর আকাশ ঢেকে ঘরে ফেরে ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বক। মাগরিবের আজানের সময় তারা চারপাশে গাছগুলো ছেয়ে ফেলে। তখন গাছের পাতার পরির্বতে পাখির পাখা ঝাপটানো দেখা যায়। গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে ইচ্ছেমতো ছবি ওঠানো যায়। তবে কোনো পাখির ক্ষতি করার চেষ্টা করলে ১ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। কয়েক বছর পূর্বে এলাকাবাসী এ নিয়ম করেছেন।
৩) মনীষীর (হাসন রাজা) বাড়ি ঃ সুনামগঞ্জের অন্যতম আকষর্ণ হাসন রাজার বাড়ী। তবে বাড়িটির বাহ্যিক দিক আকর্ষণীয় নয়। বিশিষ্ট জমিদার ও গীতিকবি হাসন রাজা বিলাসিতা পছন্দ করতেন না। ৩ লক্ষ বিঘার জমিদারী থাকলেও তিনি থাকতেন কুঁড়েঘরে। কুঁড়েঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জনসাধারণ বলাবলী করত রাজার ঘরবাড়ি ভালো লগে না। একথা শুনে হাসন রাজা লিখলেন "লোকে বলে বলেরে ঘরবাড়ি ভালো না আমার/ কি ঘর বানাইব আমি শূন্যর মাঝার”। সেখানকার শিল্পীদের মুখে গানটি শুনে তৃপ্ত হবেন। "হাসন উদাস” ও সৌখিন বাহার” নামে হাসন রাজার দুটি বই ছাপা হয়েছিল, এগুলো সেখানে খোঁজ করলে পেতে পারেন। হাসন রাজার বংশধরগণ তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে একটি তিন তলা বাড়ী নির্মাণ করে রেখেছেন। হাসন রাজার বসত ভিটা দেখার পর তার ব্যবহৃত, পোষাক, ছবি, তলোয়ার, প্লেট, খাতা, রূপার পানদানী, কলম ইত্যাদি দেখুন।
৪) জমিদার বাড়ি (সুখাইর) ঃ প্রায় ৩শ বছরের পুরোনো জমিদার বাড়ি। ১৯৬৫ সালে ২৫ একর জমি কিনে মোহনলাল এ বাড়িটি নির্মাণ করেন। এ জমিদারী বিস্তৃত ছিল পূর্বের জামালগঞ্জ, পশ্চিমে ধরম পাশা, উত্তরে বংশকুঞ্জ ও দক্ষিনে ঘাগলাজুরা নদী। সেখানে গিয়ে শুনবেন একবার ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ার বাঘ শিকারে টাঙ্গুয়ার হাওরে গেলে, বাঘ তাকে জিম্মি করে। জমিদার সুযুখ চৌধুরী আইন লঙ্ঘন করে ৩টি বাঘ মেরে তাকে উদ্ধার করলে, ইংরেজ সাহেব তাকে একটি বন্দুক উপহার দেন।
৫) মনোহরী স্থান (ছাতক) ঃ পাথর, সিমেন্ট, চুনাপাথর, তেজ পাতা, কমলালেবু ও বালুর দেশ ছাতক। চুনাপাথর দেখে মুগ্ধ হবেন। চুনাপাথর বহনকারী যন্ত্রটি দেখে অভিভুত হবেন। চুনাপাথর কিভাবে পোড়াতে হয় তাও দেখতে পাবেন।
৬) মসজিদ (পাগলা বাজার) ঃ সুনামগঞ্জ সিলেট সড়কে পাগলা বাজারের পাশে রায়পুর গ্রামে এই মসজিদটি অবস্থিত। ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট দর্শীয় এই মসজিদটি ইট ও সুড়কির তৈরি। মসজিদটি সাড়ে ৩৩ গজ দীর্ঘ ও ২২ গজ প্রস্থ। ঃ ৩য় পাতায় দেখুন ঃ।
ঘাসন রাজার দেশ
৭) বালি (নারায়ণতলা) ঃ বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান নারায়ণতলা। পাহাড়, নদী আর মরুভূমির সংমিশ্রণে আকর্ষণীয় স্থান এই নারায়ণতলা সুনামগঞ্জ জেলার উত্তরে দেশের শেষ প্রান্তে এর অবস্থান। দেশে থেকে যদি আপনি মরুভূমির পরিচয় পেতে চান, তাহলে এটা হবে উপযুক্ত জায়গা। বালুকাময় এ স্থানটির উত্তরে রয়েছে আসামের পাহাড় সারি।
৮) রিভার ভিউ (যাদুকাটা) ঃ তাহিরপুরে দিয়ে রিভারভিউ দেখতে পাবেন। বারিকের টিলার একেবারে ঘা ঘেঁষে পূর্ব দিকে বয়ে চলেছে পাহাড়ী নদী যাদুকাটা। সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা এই পাহাড়ী নদীর স্বচ্ছ টলটলে পনির নিচে শুধু বালি আর স্তরে স্তরে মজুদ পাথর দেখা যায়।
মমিনুল ইসলাম মোল্লা।
সাংবাদিক, কুমিল্লা
একটি প্রশিক্ষা ফিচার
ই-মেইল : ঢ়পঢ়ফ@ঢ়ৎড়ংযরশধ.নফড়হষরহব.পড়স
ঃ ৩য় পাতায় দেখুন ঃ
পাহাড়, অরণ্য ও জলপ্রপাতের মিলনস্থল-মাধবকুন্ড
প্রভাষক মমিনুল ইসলাম মোল্লা
সোমবার ঃ ৩ ফেব্রæয়ারী ২০০৩
রূপময় বাংলাদেশ। এদেশের আনাচে-কানাচে, শহরের অলি-গলিতে মুক্তাকনার মতো রুপময় ও আকর্র্ষনীয় স্থানগুলো ছড়িয়ে আছে কিছু কিছু স্পস্ট এথনও আবিস্কারের বাকী, যেগুলো আবিস্কৃত হয়েছে সেগুলোর প্রয়োজনীয় যতেœর অভাবে নষ্ট হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যময় নিদর্শনগুলো। তাই কেউ কেউ বলেন এদেশের পর্যটন নিয়ে লেখার কি আছে? অন্য দেশের কথা ভাবুন। আসলেই কি তাই! দেশে ও বিদেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মত কি কিছুই নেই? না। আমরা বলব, এ ধারনার কোনো যুক্তি নেই। আমাদের দেশে এমন কিছু কিছু দৃশ্য আছে যা অন্য আট/দশটি দেশে পাওয়া যাবেনা। ্এগুলো নিয়ে ছোট খাট নয় বড় করেই লিখা যায়। এমনই একটি স্থান হচ্ছে বড়লেখার মাধবকুন্ড জলপ্রপাত। এটি বাংলাদেশের নায়াগ্রা নামে পরিচিত।
যেভাবে যাবেন ঃ আপনার বাসা থেকে কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশনে যাবেন। এখান থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে চড়ে সিলেট যাবেন। এছাড়া বাসে কিংবা প্লেনে চড়েও আপনি সিলেট পৌছতে পারবেন। ঢাকা থেকে রেলপথে দূরত্ব ৩১৯ কিঃ মিঃ এবং সড়ক পথে দূরত্ব ২৭৮ কিঃ মিঃ। সিলেটেই রাতটি কাটিয়ে যান খাকার জন্য। পর্যটন হোটেল অথবা হোটেল অণুরাগ এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। সিলেট রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে দুপুর ১১ টায় উঠুন। কুলাউড়া পৌছবেন বিকাল ৪ টায়। কুলাউড়া থেকে বাসে বড়লেখা যাবেন। কাঠালতলা ক্রসিং পয়েন্ট থেকে ১০ কিঃ মিঃ পাকা রাস্তা অতিক্রম করলেই গন্তব্য স্থলে পৌছে যাবেন। গ্রæপ পিকনিকে গেলে ঢাকা থেকে গাড়ী নিয়ে সরাসরি জলপ্রপাত এলাকায় পৌছতে পারবেন।
কি কি সঙ্গে নেবেন ঃ শীতের সময় সিলেট এলাকায় খুব শীত পড়ে। সুতরাং সব কিছুর আগে আপনাকে সুয়েটার, কোট কিংবা জ্যাকেট সঙ্গে নিতে হবে। হঠ্যাৎ করে ঠান্ডা লাগতে পারে। তাই প্রয়োজনিয় ঔষধ নিয়ে যাবেন। এখানকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ঝর্ণা, অরন্য ও পাহাড়ের পাশে ছবি তুলতে ইচ্ছা করবে। তাই একটি ক্যামেরা ও কমপক্ষে দুটি ফিল্ম সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।
জলপ্রপাত ঃ এখানে পাহাড়ের বুক চিড়ে অবিরাম পানি ঝড়ছে। প্রায় ২০০ ফুট উচু পাহাড় থেকে পানি উপচে পড়ছে। এ স্বচ্ছ জলধারা গড়িয়ে চলে যাচ্ছে। এই দৃষ্টি নন্দন দৃশ্য নিজের চোখে না দেখলে অনুভব করা যায় না। জলপ্রপাতের পদদেশে সবাইকে উল্লাস করতে দেখবেন। আপনিও প্যাচামুখো না হয়ে সীমাহীন আনন্দে মেতে উঠুন। আপনার কাছে মনে হবে এ যেন সত্যিকারের নায়াগ্রা জলপ্রপাত।
সেখানে গিয়ে জানবেন, মাধবকুন্ডের পুরাতন নাম গঙ্গামায়া। তাই সেখানকার আধিবাসীরা এখনও একে গঙ্গামায়া বলে। আম, কাঠাল, আনারস আর চা বাগান দেখবেন মাধবকুন্ডে। কুন্ডটির পাশে দেখবেন বড় বড় পাথর। পাথর পেরিয়ে ঝর্ণার জল হাতে নিতে পারবেন। এ দুর্লভ মুহুর্ত জীবনে আর কখনো নাও আসতে পারে। তাই স¥ৃতিটিকে ক্যামেরায় বন্দী করে রাখুন। কুন্ডের স্থলে পাহাড়ের পাশেই একটি পাহাড়ের গুহা দেখতে পাবেন। এই গুহাকে গহবর কিংবা কাব বলা হয়ে থাকে।
জলপ্রপাতের নিচে দু একটি নৌকা দেখতে পাবেন। সেই নৌকার মাঝিরা আপনাকে দেখে হাসি মুখে আমন্ত্রন জানাবেন। ভয় না পেয়ে নৌকায় উঠে পড়–ন। সঙ্গে আপনার মনের মানুষ থাকলে ভাল হয়। যেখানে পানি পড়ছে সেখান দিয়ে এক চক্কর ঘুরে আসবেন। আসার পথে মাঝিকে খুশি করে আসবেন। তারপর আপনি অথবা আপনার ছেলে মেয়েকে ঘোড়ায় চড়াতে পারেন। ঘোড়ায় চড়ে চক্কর দিলেই আপনাকে দশ টাকা দিতে হবে।
সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গরম পানির ঝর্ণা দেখতে গিয়ে অনেকেই আঠাশ ধাপ অতিক্রম করে তেম্িন মাধবকুন্ড জলপ্রপাত দেখতে এসে আপনারও মন চইবে একবার উপরে উঠতে পারলে হয়তো আরো মজা হতো। হ্যাঁ আপনি ইচ্ছে করলেই সেখানে উঠতে পারেন। তবে উপরে না ইঠাই ভালো। প্রতি বছরই অতিরিক্ত সাহস দেখাতে গিয়ে দু/চারজন মারা যাচ্ছে। আপনি যদি আকান্তভাবে উঠতেই চান তাহলে সাবধানে উঠবেন। তবে জলের উৎসমুখে না যাওয়াই ভালো।
জলপ্রপাতের কাছেই দেখবেন একজন দোকানদার মাধবকুন্ডের ইতিহার নামে একটি ছোট পুস্তক বিক্রি করছে। ইচ্ছে হলে এক কপি কিনে নিতে পারেন। এক জরিপে দেখা গেছে শীতকালে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২শ লোক এখানে আসে। বর্ষাকালে ৩ থেকে ৫শ লোক আসে।
মাধবকুন্ড শুধুমাত্র সৌন্দর্যের লীলাভুমিই নয় এটি হিন্দুদের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবেও পরিচিত। এখানে একটি মন্দির চোখে পড়বে। মন্দিরের পাশে দেখবেন বাঘের মূর্তি। প্রত্যক বছর ফাল্গুন মাসে দেশ ও বিদেশের নানা স্থান থেকে হিন্দু পুন্যার্থীরা ঝর্ণায় ¯øান করার জন্যে ছুটে আসেন। এয়োদশী তিথীতেও বারণী ¯œানে এখানে প্রচুর পুন্যার্থীর সমাগম হয়। পাহাড়ের চড়ায় প্রতিষ্ঠিত স্বনার্থী গন ধর্মলম্বী হলে মাধবকুন্ড দেখার পাশাপাশি কিছু পুন্যও লাভ করতে পারেন।
চা বাগান ঃ মৌলভী বাজার জেলায় আরেকটি নয়নাভিরাম স্থান শ্রীমঙ্গল। এখানে পাহাড়ের উচুতে আবার কখনোবা নীচু যায়গায়। শুধু সবুজ আর সবুজ। মহিরা শ্রমিকদের চা পাতা তুলতে দেখবেন। এদের সাথে কথা বলে জেনে নিতে পারেন এদের সুখ-দুঃখের কাহিনী। তবে ভাষা নিয়ে একটু সমস্যা হতে পারে। আপনার কথা এরা বুঝলেও ওদের কথা আপনার বুঝতে কষ্ট হবে।
সেখানে গিয়ে জানবেন, মৌলভীবাজারের মালনীছড়ায় প্রথম চায়ের চাষ শুরু হয়। ১৮৫৩ সালে চায়ের গাছ আবিস্কার করেন মিঃ মোঃ ওয়ারিষ। তিনি ব্রিটিশ সরকার থেকে পুরস্কার ও পান। তারপর থেকেই চা চাষের শুরু। তখন চা বাগানে কাজ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার বিহার, মধ্য প্রদেশ ও উড়িষ্য থেকে শ্রমিক আনে। তাই এদের ভাষা আপনি পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না। এরা সকালে লবনসহ রুটি খেয়ে বাগানে আসে বিকালে বাসায় ফিরে লবন-চা এবং রাতে ভাত খায়।
কমলা রানীর দীঘি ঃ মৌলভীবাজার থেকে ১৫ কিঃ মিঃ দূরে রাজনগর। এখানে দেখবেন কমলা রানীর দীঘি বা সাগর দীঘি। মধ্যযুগে এখানে সুব্দি নারায়ন নামে এক রাজা ছিলেন। তার স্ত্রী কমলা রানীর নামে।
