চীন থেকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত ভাইরাস ‘করোনা’। যে ভাইরাসের সাথে কিছুদিন আগেও মানুষ পরিচিত ছিলো না।
কারণ, এই ভাইরাস এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে দেখা যায়নি। তবে ২০০২ সালে চীনে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামের একটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল, যাতে সংক্রমিত হয়েছিল ৮ হাজার ৯৮ জন। মারা গিয়েছিল ৭৭৪ জন। সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস। যার লক্ষণগুলো হলো- কাশি, জ্বর, শ্বাস-কষ্ট, নিউমোনিয়া।
ব্যাপক হারে মানুষ আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হলে আল্লাহ পাক পৃথিবীতে গজব নাজিল করেন; যাতে মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পেরে তাওবার মাধ্যমে আবার ফিরে আসতে পারে। এই গজব বা মহামারি আসলে তখন করণীয় কী? ইসলামে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে
নিরাপত্তাঃ আমরা সবসময় আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা কামনা করব। আমাদের নবিজী আমাদেরকে দোয়া শিখিয়ে গিয়েছেন। এমনই একটি দোয়া হলোঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা কামনা করছি। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার দ্বীন ও দুনিয়া, পরিবার ও সম্পদ বিষয়ে ক্ষমা ও নিরাপত্তা কামনা করছি। হে আল্লাহ! তুমি গোপন ব্যাপারগুলো আচ্ছাদিত করে রাখো। ভয়-ভীতি থেকে আমাকে নিরাপত্তা দাও। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে নিরাপদে রাখ, আমার সম্মুখের বিপদ হতে, পশ্চাতের বিপদ হতে, ডানের বিপদ হতে, বামের বিপদ হতে আর ঊর্ধ্ব দেশের গজব হতে। তোমার মহত্ত্বের দোহাই দিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমার নিম্নদেশ হতে আগত বিপদে আকস্মিক মৃত্যু হতে। [আবু দাউদ : ৪৪১২]
প্লেগঃ প্লেগ একটি মারাত্মক রোগ। এ পর্যন্ত বহু দেশে প্লেগ রোগে লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেছে। ইসহাক (র)................নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিণী আয়েশা থেকে বর্ণিত যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে প্লেগ রোগের কথা জিজ্ঞামা করেন। তখন আল্লাহর নবী (রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে অবহিত করেন যে, এটি হচ্ছে এক প্রকারের আযাব। আল্লাহ যার উপর তা পাঠাতে ইচ্ছা করেন, পাঠান। কিন্তু আল্লাহ এটিকে মুমিনদের জন্য রহমতস্বরূপ বানিয়ে দিয়েছেন। অতএব প্লেগ রোগে কোন বান্দা যদি ধৈর্যধারণ করে, এই বিশ্বাস নিয়ে আপন শহরে অবস্থান করতে থাকে যে, আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন তা ব্যতীত আর কোন বিপদ তার উপর আসবে না; তাহলে সেই বান্দার জন্য থাকবে শহীদ ব্যক্তির সাওয়াবের সমান সাওয়া। দাউদ থেকে নাযরও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।তাহক্বীক:: মারফু হাদিস।তাখরীজ :: [ বুখারীঃ তা.পা ৫৭৩৪, ৩৪৭৪] ( আ.প্র. ৫৩১৪ ই.ফা. ৫২১০)হাফস ইবনু উমর (র)............উসামা ইবনু যায়েদ থেকে, তিনি সা‘দ -এর কাছে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেনঃ যখন তোমরা কেন এলাকায় প্লেগের প্রাদুর্ভাবের সংবাদ শোন, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, তথায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। (বর্ণনাকারী হাবীব ইবনু আবূ সাবিত বলেন) আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ আপনি কি উসামা -কে এ হাদীস সা‘দ -এর কাছে বর্ণনা করতে শুনেছেন যে, তিনি (সা‘দ) তাতে কোন অসমমতি প্রকাশ করেন নি? ইবরাহীম ইবনু সা‘দ বলেনঃ হাঁ।তাহক্বীক:: মারফু হাদিস।তাখরীজ :: [ বুখারীঃ তা.পা ৫৭২৮, ৩৪৭৩] (ই.ফা. ৫৩০৮ ই.ফা. ৫২০৪)
অধিকাংশ রোগই আসে আমাদের পাপের কারণে। ‘আফফান (র) বলেন, সালিম ইবনু হায়য়ান, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, রোগের কোন সংক্রমণই নেই, কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই, পেচা অশুভের প্রতিক নয়, সফর মাসের কোন অশুভ নেই। কুষ্ঠ রোগী থেকে দূরে থাক, যেভাবে তুমি দূরে থাক তুমি বাঘ থেকে।তাহক্বীক:: মারফু হাদিস। আল্লাহ বলেন:﴿ وَنَجَّيۡنَٰهُ وَلُوطًا إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ٱلَّتِي بَٰرَكۡنَا فِيهَا لِلۡعَٰلَمِينَ ٧١ ﴾ [الانبياء: ٧١]“আর আমি তাকে ও লুতকে উদ্ধার করে সে দেশে নিয়ে গেলাম, যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্য বরকত রেখেছি”।
আজাবঃ শয়তান আমাদেরকে অঅল্লাহর আজাবের দিকে ঠেলৈ দেয়। শয়তান আমাদের প্রকাশ্য শত্রু।পবিত্র কুরানুল কারিমে আছে,‘সে তাদের কাছে কসম করে বলল, আমি অবশ্যই তোমাদের উভয়ের জন্যে হিতাকাঙ্ক্ষীদের একজন এবং সে আদ ও সামুদ সম্প্রদায়ের জন্য তাদের কাজকে সুশোভিত করে প্রদর্শন করেছে।وَعَادًا وَثَمُودَ وَقَدْ تَبَيَّنَ لَكُمْ مِنْ مَسَاكِنِهِمْ وَزَيَّنَ لَهُمَ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَكَانُوا مُسْتَبْصِرِينَ. ﴿العنكبوت ‘আদ এবং সামুদকেও (আমি ধ্বংস করেছিলাম), তাদের (ধ্বংসপ্রাপ্ত) বসতি থেকেই তো তোমাদের কাছে (আজাবের সত্যতা) প্রমাণিত হয়ে গেছে। শয়তান তাদের কাজ (তাদের সামনে শোভন করে রেখেছিল এবং (এ কৌশল) সে তাদের (সঠিক) রাস্তা থেকে ফিরিয়ে রেখেছিল, অথচ তারা (তাদের অন্য সব ব্যাপারে) ছিল দারুণ বিচক্ষণ।’ আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন এ পর্যন্ত কত জাতিকে ধ্বংস করেছেন তা কেউ বলতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের কাছে কি সংবাদ আসেনি তোমাদের পূর্ববর্তীদের; নূহের সম্প্রদায়ের, আ’দের ও সামুদের এবং তাদের পরবর্তীদের? তাদের বিষয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। (ইব্রাহিমঃ ৯)। কোন প্রকার রোগ অথবা বিপদে আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ, আল্লাহর কাজের সমালোচনা অথবা আল্লাহর কোন দোষ বের করার অধিকার কোন বান্দার নেই। যেহেতু সকল বিধানে তিনি নিখুঁত বিধায়ক। “কেন” বলে অভিযোগ বা আপত্তি করার অবকাশ ও অধিকার নেই কারো। মহান আল্লাহ বলেন, আল্লাহ আদেশ করেন। তাঁর আদেশের সমালোচনা (পুনবিবেচনা) করার কেউ নেই এবং তিনি হিসাব গ্রহনে তৎপর (রা’দঃ ৪১) তিনি যা করেন, সে বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে না; বরং ওদেরকেই প্রশ্ন করা হবে (আম্বিয়াঃ ২৩)
নমরুদঃ নমরুদ-ফিরাউনের প্রেতাত্মা সর্বকালেই চেষ্টা করেছে সমাজ ও জাতির পরিচালকদের কাঁধে সওয়ার হতে। তাই পূর্ব থেকেই সতর্ক করা হয়েছে জুলুমের এই অপরিদর্শী পথ থেকে। কিন্তু ইতিহাসের সবচে বড় শিক্ষা কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। পৃথিবীর ধ্বংসপ্রাপ্ত বহুজাতির ইতিহাস রোমন্থনও পারে না তাই মানুষকে নিপীড়ন-নিষ্পেষণের নিন্দিত পথ থেকে বিরত রাখতে। অত্যাচারীরা সব সময়ই নিজের শক্তির মরীচিকার দন্ধে পড়ে অত্যাচার চালিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলে দিচ্ছেন,وَأَنذِرۡهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡأٓزِفَةِ إِذِ ٱلۡقُلُوبُ لَدَى ٱلۡحَنَاجِرِ كَٰظِمِينَۚ مَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ حَمِيم وَلَا شَفِيع يُطَاعُ ١٨ ﴾ [غافر: ١٨] ‘আর তুমি তাদেরকে আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। যখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। অত্যাচারীদের জন্য নেই কোনো অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোনো সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। {সূরা আল-মু’মিন, আয়াত : ১৮}আরেক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِن نَّصِير ٧١ ﴾ [الحج: ٧١] ‘আর যালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই’। {সূরা আল-হজ, আয়াত : ৭১}শুধু শাসক বা উপরস্থ পর্যায়েই নয়, আমাদের ব্যক্তি জীবন থেকে নিয়ে প্রতিটি স্তরে জুলুম পরিহার করতে হবে। যে কোনো ধরনের অনাচার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় সবাইকে একদিন এমন বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে যার কাছে কোনো কারচুপি বা দুর্নীতি করে বাঁচার সুযোগ নেই। যিনি সব শাসকের শাসক এবং সব বিচারকের নির্ভুল বিচারক। কিয়ামতের সেই দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে একাধিক হাদীসে। জাবের ইবন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, « اتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ».‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কারণ জুলুম কিয়ামতের দিন অনেক অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’ [মুসলিম : ৬৭৪১]
মমিনুল ইসলাম মোল্লা, কলামিস্ট, গবেষক ও সাংবাদিক
