কর দিন দেশসেবায় শরিক হোন
মমিনুল ইসলাম মোল্লাবাংলাদেশে দু ধরণের কর প্রচলিত রয়েছে। একটি প্রত্যক্ষ কর এবং অন্যটি পরোক্ষ কর নামে পরিচিত। প্রত্যক্ষ কর এমন এক ধরণের কর যা করদাতার নিকট থেকে সরাসরি আদায় করা হয়। অন্যদিকে পরোক্ষ করের ক্ষেত্রে কর প্রদানকারী একজন এবং কর বহনকারী অন্যজন হয়ে থাকে। আয় কর আমাদের দেশের রাজস্ব আদায়ের দ্বিতীয় প্রধান উৎস।১৫ নভেম্বর পর্যন্ত আয়কর রিটার্নের সময় ছিল। দেশের ৩৫ লাখ ২৮ হাজার টিআইএনধারী ব্যক্তির মধ্যে এসময় ৯ লাখ করদাদাতা বিবরণী জমা দিয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এবছর ৪ লাখ আয়কর বিবরনী কম জমা পড়েছে। এ বছর নির্দিষ্ট সময়ের পরও াারও দেড়মাস সময় দেয়া হলেও অনেকেই তা জমা দিতে ব্যার্থ হয়। ঊল্লেখ্য গত বছর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয়করবিবরণী জমা পড়েছিল ১৪ লাখ। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে ,যারা এর মধ্যে জমা দিতে পারেনি তাদেরকে আর সময় দেয়া হবেনা। কোন অবস্থাতেই আর সময় বৃদ্ধি করা হবে না। ১৯৮৪ সালের বিধি অনুযায়ী টিআইএন থাকা সত্তেও উপযুক্ত কারণ ছাড়া রিটার্ন দাখিল না করলে করদাতাকে এককালীন ১ ৯াজার টাকা এবং প্রতিদিনের জন্য ৫০ টাকা হারে জরিমানা করা হবে।
নাগরিকের আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে সরকার প্রত্যক্ষ কর আদায় করে। আয় কর প্রত্যক্ষ করের একটি অংশ। এ ধরণের কর বাৎসরিক আয়ের ভিত্তিতে আদায় করা হয়। প্রত্যক্ষ কর নাগরিকের উপর ধার্য করা হয় এবং তা সরকারি কোষাগারে সরাসরি জমা করা হয়। বছর শেষে আয়করের হিসেব নিকেষ করা হয়। একটি নির্ধারিত ফর্মে ব্যাক্তির আয়-ব্যায় ও করের পরিমাণ উলেখ করতে হয়। এটাকে বলা হয় আয়কর রিটার্ন। বর্তমানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কেনি ব্যক্তির আয় লক্ষ টাকার বেশি হলে ঐ ব্যক্তিকে রিটার্ন দিতে হবে। এছাড়াও মহিলা হলে অথবা কোন ব্যক্তির বয়স ৬৫ বছরের বেশি হলে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার বেশি হলে অথবা প্রতিবন্ধী করদাতার ক্ষেত্রে যদি ২ লাখ ৭৫হাজার টাকার বেশি হয় তবে তাকে অবশ্যই রিটার্ন দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ করের অবদান কম। ২০০৯-২০১০ অর্থব্ছর সংগৃহীত রাজস্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ করের অবদান ছিল মাত্র ২৪ শতাংশ। ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে এর পরিমান ছিল ২২ শতাংশ। আয়কর বলতে কউ কউ ব্যাক্তি কর হিসেবে বুঝে থাকেন। কিন্তু আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ তে ব্যক্তি বা পারসন বলতে বুঝানো হয়েছে-(ইনডিভিজুয়াল,) একান্নবর্তী হিন্দু পরিবার, (হিন্দু আনডিভাইডেড ফ্যামিলী) অংশীদারী কারবার, কোম্পানি, এসোসিয়েশন অব পারসন সবাইকে বুঝায়। অর্থাৎ যারা আয়কর দেয় তারা সবাই ব্যাক্ত নামে আইনের ভাষায় পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরর্সংখানের দিকে তাকালে দেখা যায় ২০১১-১২ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য মাত্রা ছিল ৯২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে এর চেয়ে অনেকবেশি। অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ ২ হাজার ২১১ কোটি ৩ লাখ টাকা। ২০১০-১১ অর্থ বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৭৯ হাজার ৪০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে আয় কর থেকে আদায় হয়েছে ২৩ হাজার ৭ কোটি ৫ লাখ টাকা। অন্যান্য শুল্ক ও কর আদায় হয়েছে ৪১২ কোটি ৪ লাখ টাকা যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি।
।কারও যদি জেলা শহর, পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনের আওতায় একতলা বাড়ি থাকে(যার প্রতি তলার আয়তন ১৬০০ বর্গফুট) যদি মোটরগাড়ি, থাকে, একটি আইএসডি টেলিফোন থাকে, ট্রেড লাইসেন্সধারী, ব্যাবসায়ী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, চার্টার্ড একাউন্টেন্ড, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি কর্পোরেশনের যে কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কিংবা টেন্ডারে অংশগ্রহণকারীরা আয়করের অন্তভূক্ত হবেন।
বর্তমানে দেশে করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ টাকা,। অর্থাৎ বার্ষিক ২ লক্ষ ািকার উপরে আয় হলে যে কোন ব্যক্তি আয়করের আওতায় আসবেন। এ হিসেবে দেশের ১ কোটি লোক আয়কর দেয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে টিআইএন নম্বরধারী লোকের সংখ্যা ৩০ লাখ। এদের মধ্যে তিন ভাগের দুই ভাগ আয়ের বিবরণী সঠিকভাবে জমা দেন না। তারা নিয়মিত কর পরিশোধ করন না। ১৯২২ সালের আয়কর আইন দ্বারা স্বাধীনতাত্তোরকোলে আয়কর আদায় করা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে এ আইন সংশোধন করা হয়।
দেশের প্রভাবশালীদের অনেকেই আয়কর দেন না অথবা ফাঁকি দেন। এ শ্রেণির লোকদের মধ্যে রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী, ভূমিদস্যুরা তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। আমাদের জিডিপি ২১৪ বিলিয়ন ডলার ধরলে আরো ৯০ থেকে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার কালো টাকা হিসেবে দুর্নীতিবাজরা গত বছর আয় করেছ। কালো টাকার মালিক কমপক্ষে ৪০লাখ মানুষ, ১৬ কোটির মিলিত আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলার ধরলে দুর্নীতিবাজ ৪০ লাখের আয় ২৪০ বিলিয়ন ডলার। তারা সঠিকভাবে কর প্রদান করলে দেশের এত দুরবস্থা হতো না। আমাদের দেশে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা যেমন রয়েছে তেমনি বেশি কর দিচ্ছেন এমন লোকও আছে। অতিরিক্ত কর দেয়া হলে তা ফেরৎ পাবার বিধান চালু থাকলেও তা পেতে পতে কর দাতাদের জুতার শুকতলি ক্ষয় হয়ে যায়। তাই জন সাধারণ কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হন। তাছাড়া কর প্রদানে জন সাধারণ এখনও হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। তাই মানুষের মধ্যে করের ভীতি লক্ষ্য করা যায়। কর আদায় বাড়াতে এ ভীতি দূর করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরো সহজ হতে হবে। কর ফর্মগুলো যাতে সাধারণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বুঝতে পারে এমন ঋণের সহজ বাংলা লিখতে হবে। এবছর আয়কর অদায়ের লক্ষে সরকার বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে। এসবের মধ্যে রয়েছে আয়কর মেলা, অনলাইনে আয় কর দেয়া, বিজ্ঞাপন প্রচারসহ নানা আয়োজন ইত্যাদি। কিন্তু তারপরও গতবছরের মতো বাড়েনি। ২০১২-১৩ অর্থ বছরের জন্য আয়কর আদায়ের লক্ষ্যম্ত্রাা নির্ধারণ করা হয় ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গত অর্থ বছরে লক্ষ্য মাত্রা ছিল ২৭ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশের ৩২টি কর অঞ্চেলের কর্মকর্তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এবছর জুলাই মাসে লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।এসময় কর আদায় হয়েছে ১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। যা প্রশংসার দাবী রাখে। বর্তমানে দোকান বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে টিআইএন সার্টিফিকেট ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে,গাড়িগুলোতে স্টিকার লাগিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কর ফাঁকি দেয়া রোধ করা না গেলে দেশের রাজস্ব আয় বাড়ানো যাবে না। এক্ষেত্রে এনবিআর এর চেয়ারম্যান বলেছেন-কর ফাঁকি রোধ করা হবে। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি ,কর বিভাগের স¤প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে এনবিাআরকে শক্তিশালী করা হবে।’
আয়কর সঠিকভাবে আদায় করা না গেলে দেশ পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে।বৈদেশিক সাহায্যের মাধ্যমে দেশ কখনও উন্নতি লাভ করতে পারে না। এছাড়াও সাহায্য প্রদানের সময় দাতা দেশগুলো কঠোর শর্ত আরোপ করে যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামল। তাই পরনির্ভরশীলতা কাটাতে হরে আমাদের সকলকে কর প্রদানে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এটি আমাদের একটি নৈতিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র কবে কোথায় কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে এ নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই যে কর প্রদানের সিস্টেম চালু হয়েছে এ নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। মূলত নাগরিকদের কর প্রদানের উপরই একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভরশীল। তবে শুধুমাত্র কর আদায় করলেই দেশের উন্নয়ন হবে না। জনসাধারণের নিকট থেকে আদায়কৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি তরান্বিত হবে না। উন্নত দেশগুলোতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রধান উৎস হচ্ছে প্রত্যক্ষ কর। ফলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা , শিল্প অবকাঠামো, সবকিছুই উন্নত। বাংরাদেশে নিবন্ধিত কর দাতার সংখ্যা ৩৬ লাখ হলেও কর দিচ্ছে মাত্র ১০ লাখ লোক। অর্থনীতিবিদদের মতে দেশের ৫০ হাজার লোক রয়েছেন যারা ১ কোটি টাকার উপর কর দিতে পারেন। আমাদের দেশের মানুষের কর প্রদানের মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারলে বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই এদেশের উন্নতি সাধন করা সম্ভব।
লেখক: কলেজ শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট,কুমিল্লা।আরকাইভস থকেে ৩১/০৮/২০১৭