উৎপাদনমুখী খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

উৎপাদনমুখী খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

মমিনুল ইসলাম মোল্লা,

 বিনিয়োগ বোর্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন এ ছয় মাসে নিবন্ধিত মোট যৌথ ও শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমান ২১ কোটি ৫০ লাখ ১২ হাজার ডলার। অথচ গত বছরের একই সময়ে এর পরিমান ছিল ৪৫ কোটি ৩৩ লাখ ৫৫ হাজার ডলার। এ হিসেবেই নিবন্ধিত বিনিয়োগের পরিমান কমেছে ৫২.৫৭ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধনের পাশাপাশি নিবন্ধিত প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে। গত বছরের প্রথমে নিবন্ধিত প্রকল্প সংখ্যা ছিল ১২৩। চলতি বছর এর পরিমান কমে হয়েছে ৬৬টি।এ হিসেবে প্রকল্প কমেছে ৪৬.৩৪ শতাংশ। গত বছরের প্রথমার্ধে সবগুলো মাসের মধ্যে নিবন্ধিত সর্বোচ্চ প্রকল্প সংখ্যা ৪৬ দশমিক৩৪ শতাংশ। গত বছরের  প্রথমার্ধে সবগুলো মাসের মধ্যে নিবন্ধিত সর্বোচ্চ প্রকল্প সংখ্যা ৩১ আর সর্বনিম্ন ১৩। চলতি বছরের প্রথমার্ধে একসাথে সর্বোচ্চ প্রকল্প সংখ্যা ১৬ আর সর্বম্নি ৭।বিদেশি কোম্পানিগুলোতে বহু বাংলাদেশি কাজ করছে। ফলে দেশের বেকারত্ব কমে যাচ্ছে। নিবন্ধিত বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে প্রস্তাবিত কর্মসংস্থানও কমে গেছে। চলতি বছর ৬ মাসে নিবন্ধিত প্রকল্পগুলোয় প্রস্তাবিত কর্মসংস্থানের পরিমান ১৩ হাজার ৩ জন। গত বছর একই সময়ে এর পরিমান ছিল ২০ হাজার ৫৭১ জন। শতকরা হিসেবে কমেছে ৩৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৩ সালের শুধুমাত্র জুন মাসে নিবন্ধিত প্রকল্পগুলোর প্রস্তাবিত কর্মসংস্থানের পরিমান ছিল ৩ হাজার ২৬৯ জন। অথচ চলতি বছর কমে হয়েছে ১ হাজার ৪০০ জন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে বিনিয়োগ কমছে। পরিসংখ্যান অনযায়ী ২০১২ সালে বেশি বিনিয়োগ এসেছে ব্যাংকিং, টেক্সটাইল এবং টেলিকমিউনিকেশন্স খাতে। এ সময় টেলিকমিউনিকেশন ৩২৪ মিলিয়ন ইউএস ডলার, টেক্সটাইল ৪২২২ মিলিয়ন, ব্যাংকিং ৩২৭ মিলিয়ন, বিদ্যুৎ জ্বালনিী ও পেট্রোলিয়াম, ৯৯ মিলিয়ন, ফুড প্রডাক্টস, ৪০ মিলিয়ন, এগ্রিকালচারাল এন্ড ফিসিং ৩১ মিলিয়ন এবং অন্যান্য শিল্পে ৩৫৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার বিনিয়্গে হয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় সল্পোন্নত দেশগুলোতে ( এলডিসি) বেসরকারি বিনিয়োগের অংশগ্রহণ কমেছে। টেলিযোগাযোগ খাত বাংলাদেশের বিনিয়োগের একটি উজ্বল খাত। ২০০৮-২০০৯, এবং ০৯-১০ অর্থ বছরে এখাতে বড় ধরণের বিনিয়োগ এসেছে। বাংলাদেশে বহু বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। ২০০৮-২০০৯, ০৯-১০ অর্থবছরে বাংকিং খাতে যে পরিমান বিনিয়োগ এসেছে পরের ৩ বছর তা ক্রমাগত বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেনের ভারসাম্য সারণীর হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে ২০১৩-১৪ অর্থ বছর শেষে দেশে মোট প্রত্যক্ষ্য বিদেিেশ বিনিয়োগের পরিমান দাড়িয়েছে ১৫৫ কোটি ডলার। ২০১২-১৩ অর্থ বছর শেষে তা ছিল ১৭৩ কোটি ডলার। ২০১১ -১২ অর্থ বছরে ১১৯ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে । চলতি ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক একচেঞ্জে ( ডিএসই) প্রায় ৮০ কোটি টাকার বা এক কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এর আগের বছর একই সময়ে এই বিনিয়োগের পরিমান ছিল প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা। সে হিসেবে বিনিয়োগের পরিমান কমেছে ১০৯ কোটি টাকা। বিনিয়োগ বোর্ড সূত্র জানায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের খাত অবারিত।তবে ৫টি নির্দিষ্ট খাতে বিদেশি বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। এগুলো হলো প্রতিরক্ষা, আনবিক শক্তি, সংরক্ষিত বনভূমি টাকশাল ও রেল। বিসিআই এর মতে উচ্চ সুদের হার ও জটিল কর ব্যবস্থা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই এগুলো আরো সহজ করতে হবে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিমান ২০১২ সালেও ভাল ছিল। অঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়েছিল। একই সময় ভারতে বেড়েছিল ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ সংস্থার বিশ্ব বিনিয়োগ রিপোর্ট ২০১৪ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানা যায় ২০১৩ সালে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০১২ সালে এ বিনিয়োগ হয়েছে ১৫৯ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার যার পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। জ্বালানী উপদেস্টা বলেন, রাজৈনেতিক অস্থিরতার পরেও বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে ২৪ শতাংশ । বিনিয়োগ হয়েছে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার নতুন নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান করছে। বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠন করা হচ্ছে বিএসএস। গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মান করা হবে। ইন্ডাস্ট্রিতে বিদ্যুৎ দিতে অবক্ঠামো নির্মান করা হচ্ছে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পাশপাশি ইউরেপিীয় ইউনিয়ন , কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সহ প্রাায় সব উন্নত দেশে বাংলাদেিেশ পন্য এখন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাচ্ছে। তার মানে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেএসব দেশে রফতাানি করলে বাজার সুবিধা পাওয়া যাবে। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ সুবিধা নেই। বাংলাদেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য সরকার ৩২ টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি করছে। আরও ৮টি দেশের সাথে স¤প্রীতিমূলক চুক্তি করার চেষ্টা চলছে। একইভাবে আরও ২৮টি দেশের সঙ্গে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আরো ২১ টি দেশের সঙ্গে বিশেষ ধরণের চুক্তি হবে। এ চুক্তিত অনুযায়ী বিদেশি বিনিয়োগকারীকে যে কোন দেশে আয়কর দিলেই চলবে। 
বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার জন্য সরকারের প্রয়াস চলছে। বিনিয়োগের ক্ষ্রেত্রে ১৭টি কর অবকাশ সুবিধা রয়েছে, যা ২০১৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বোর্ড যে একিেন্দ্রক সেবা ( ওয়ান স্টপ সার্ভিস) চালু করেছে তাকে আরো স¤প্রসারিত করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ বোর্ডকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশিদারী পিপিপি ও প্রস্তাবিত অর্থনেতিক অঞ্চল কর্তপক্ষ পৃথকবাবে না করে একই বোর্ডের আওতায় রাখা যেতে পারে। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) এর সভাপতি আফতাব উল ইসলাম বলেন, অবকাঠামো বা গ্যাস বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা যতটা বলা হচ্ছে , প্রকৃত সমস্যা ততটা নয়। এসব কাটিয়ে উঠা সম্বব যদি সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায় তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগ বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের জন্য নানা ধরণের সুযোগ-সুবিধা দিয়েও বিনিয়োগ বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ বিনিয়োগের জন্য তারা যে সব সুযোগ –সুবিধা সমৃদ্ধ এসইজেড গঠনের পরিকল্পনা করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন সম্বব হযনি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ মাহবুব আলী জানান, বিদেশি উদ্যোক্তাদের শুধু মুনাফা ফেরৎ নেয়ার সুযোগ দিলেই তারা বিনিয়োগ উৎসাহী হবে না। বরং বিনিয়োগের জন্য গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ ও নি®কণ্টক ভূমির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর। দেশে এখন হরতাল বা অবরোধ না থাকলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক রয়ে গেছে। দেশীয় উদ্যোক্তারা যে ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিলেন তা তারা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেস্টা ডঃ এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগের গতি প্রকৃতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কিছু নিই। বিনিয়োগের গতি এখনও নিম্নমুখী। কম্বোডিয়ার মতো দেশে যেখানে গড়ে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ হয় সেখানে বাংলাদেশে হচ্ছে মাত্র ১ মিলিয়ন ডলার বা এরও কম। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো কার্যকর করতে হবেঃ ১. বিনিয়োগ বোর্ড মাসিক সভায় মিলিত হবেন। প্রধানমন্ত্রী সে সভায় সভাপতিত্ব করবেন। বিনিয়োগ বোর্ডের সিদ্বান্ত সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এ এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রতিটি মন্ত্রণালয় , বিভাগ ও সরকারি সংস্থার উপর বাধ্যতামূলক করতে হবে। ৩. কর অবকাশ, আবগারি শূল্ক ,মূল্য সংযোজন কর, উপযোগ সেবা, ইত্যাদি বিষয়ে বিনিয়োগ, বোর্ডের সিদ্ধান্তসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত করতে হবে। বিদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিশনে মিনিস্টার পর্যায়ের একজন বিনিয়োগ কর্মকর্তা থাকবেন, তিনি বিনিয়োগবোর্ডের তত্তাবধানে বা সাথে কাজ করবেন। ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা,গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের ক্যাম্পেনার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের  প্রভাষক ও সাংবাদিক, ধর্মীয় গবেষক,সহকারী সম্পাদক,দৃষ্টান্ত ডট কম কুমিল্লা।   
২৫.১০.২০১৪


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.