কুমিল্লার হারিয়ে যাওয়া নগরী “গুনিকাগ্রহার”

তথ্য কণিকা

কুমিল্লার হারিয়ে যাওয়া নগরী “গুনিকাগ্রহার”

মমিনুল ইসলাম মোল্লা
প্রতœতাত্তিক নিদর্শন হিসেবে কুমিল্লার ময়নামতির স্থান অন্যতম।  কুমিল্লার দেবিদ্বারের গুনাইঘর ও  ছিল তেমনি একটি প্রাচীন নগরী। আজ সেখানে কোন স্মৃতি-চিহ্ন দেখা না গেলেও হারিয়ে যাওয়া এ নগরীর গৌরবময় ইতিহাস এখন ও এলাকাবাসীর নিকট অম্লান হয়ে আছে। গুপ্ত সম্রোটদের মধ্যে সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন রাজাধিরাজ। সমুদ্রগুপ্তের “এলাহাবাদ তাম্রলিপিতে” সমতটের নাম উল্লেখ রয়েছে। আর এই সমতটের রাজধানী ছিল দেবিদ্বারের বরকামতা। ১৯২৪ সালে মধ্য গুনাইঘরের একটি মজা পুকুর খনন করতে গিয়ে মাটিকাটা শ্রমিকদের মাধ্যমে বেরিয়ে এল গৌরবময় ইতিহাস। এখানে পাওয়া গেল একটি তাম্রলিপি। তাম্রলিপিটি সংস্কৃত ভাষায় লিখা। এর পাঠোদ্ধার করে জানা যায়-“এখানকার শাসক গন ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।” তাম্রলিপিতে আচার্য শান্তি দেব ও জিত সেন গুপ্তের নাম উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও বৈন্যগুপ্তের নাম বিশেভাবে স্থান পেয়েছে। 
গুনাইঘরে ৩টি বিহার ছিল বলে জানা যায়। এগুলো হচ্ছে রাজ বিহার, বৌদ্ধ বিহার, ও আশ্রম বিহার ।এখানে শিব মন্দির ছিল বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়। এ মন্দিরটি কামদেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল। শাক্যভিক্ষু আচার্য জিতসেনের একটি বিহারের উল্লেখসহ এ অঞ্চলে আরো বহু  কীর্তি মাটি চাঁপা পড়ে আছে বলে মনে করা হয়। এখানকার বিহারগুলোর মধ্যে আশ্রম বিহার ছিল অন্যতম। জানা যায়-১৮৮ গুপ্তাব্দে (৫০৭খ্রি) এবিহার নির্মাণ করা হয়। রাজ বিহারের পাশে এটি নির্মাণ করা হয়। রাজবিহারটি আরো অনেক দিন আগে তৈরি করা হয়েছিল। এখানে প্রাপ্ত দলিলপত্রের মধ্যে বৈন্যগুপ্তের তা¤্রশাসন উল্লেখযোগ্য। এটি বিহারের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয়। বিহারের নি¤œতম স্তরে এটি রাখা ছিল বলে জানা যায়। এর আয়তন ছিল ২৬.৬৭সে.মি*১৫.৮৭সে.মি। এই লিপিটির পাঠোদ্ধার করা যায়নি। এটি পড়া গেলে আরো বহু অজানা ইতিহাস বেরিয়ে আসতো। তামার পাতের উপরের অংশে প্রায় ৯.২১সে.মি*১১.৭৫সে.মি আয়তনের একটি সিল মোহর রয়েছে। তাতে একটি উপবিষ্ট ষাড়ের মূর্তি উৎকীর্ণ রয়েছে। মূর্তির নীচে এক পঙক্তির একটি লিপি রয়েছে তাতে লেখা রয়েছে “মহারাজা শ্রী বৈন্যগুপ্তেশ্বর” 
এছাড়া দেবিদ্বারের বরকামতায় সমতটের রাজধানী ছিল বলে জানা যায়। গুনাইঘর তা¤্রশাসনে ৬ষ্ঠ শতকের বহু তথ্য পাওয়া যায়। ৬ষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দশকে সামন্ত রাজা রুদ্রদত্তের  অনুরোধে বৌদ্ধ বিহারের জন্য ভূমি দান করেছিলেন। মহারাজ রুদ্রদত্ত গুনাইঘরে অনন্দ বিহার নির্মাণের জন্য ৫টি পৃথক ভূখন্ডে সর্বশুদ্ধ ১১ পাটক ভূমি দান করেছেন। বৈন্যগুপ্তের গুনাইঘর পট্টালিতে দেখা যায়, মহারাজ বৈন্যগুপ্তের কাছে ভুমির জন্য আবেদন করেছেন মহারাজ রুদ্রদত্ত। তিনি ছিলেন বৈন্যগুপ্তের সামন্ত রাজা। তবে বৈন্যগুপ্ত তাকে অর্থের বিনিময়ে নাকি বিনা অর্থে জমি দান করেছিরলেন তা স্পষ্প নয়।  তাম্রলিপিতে এর কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। জমিদানের ব্যাপারে বৈন্য গুপ্ত মনে করেন -তার পিতা-মাতা ও নিজের পূণ্য বৃদ্ধি পাবে। গুনাইঘরের ইতিহাস অজানা ছিল বহু বছর। হয়ত এ সমৃদ্ধ সভ্যতার ইতিহাস আরো দীর্ঘদিন আমাদের আজানা থাকতো। সৌভাগ্যবশত: জ্ঞান রাজ্যের দুয়ার খুলে দিল একটি তাম্রশাসন। গুনাইঘরের একটি মজা পুকুর খনন করতে গিয়েই বেরিয়ে এল এক সুপ্রাচীন সভ্যতা। সে সভ্যতা ছিল গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতা। সরকারিভাবে সেখানে গবেষনা ও অনুধাবন করলে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। 
 লেখক:কলেজ শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলাম লেখক 


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.